২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর নানা সম্ভাবনা, সফলতা ও সংকটের গল্প নিয়ে ১৬ বছর পেরিয়ে পূর্ণ করছে ১৭ তম বছর। তবে এ ১৭ বছরে যেন অপূর্ণতা, সংকট ও চ্যালেঞ্জের বাস্তবতাই ফুটে উঠেছে বারবার। এখনও পর্যন্ত একাডেমিক কিংবা অবকাঠামো, কোনোদিকেই পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি উত্তরের এই বিশ্ববিদ্যালয়টি।
প্রতিষ্ঠার পর ভবন প্রস্তুতের আগ পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে রংপুর টিচার্স ট্রেইনিং কলেজে কাজ করার কয়েকবছর পর প্রশাসনিকভবন ও ৪টি একাডেমিক ভবন নিয়ে যাত্রা শুরু করে নিজ ক্যাম্পাসে। পরে একটি লাইব্রেরি, ২০১৫ সালের দিকে একটি ছাত্রী ও দুটি ছাত্রহল এবং আরো পরে একটি ক্যাফেটেরিয়া ও ৩টি শিক্ষক, কর্মকর্তাদের ভবন চালু করা হয়। কিন্তু এরপর থেকে এই ভবনগুলো ছাড়া নতুন করে তেমন উল্লেখযোগ্য ভবনও তৈরি হয়নি এত বছরেও। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ বছরে যেন শত সংকট ও অপূর্ণতা রয়ে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে মাত্র ৩টি ছোট ছোট হল যার ধারণ ক্ষমতা মাত্র ৮শ, ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী পায় আবাসন সুবিধা, ৪টি অপরিকল্পিত একাডেমিক ভবন, একটি অপূর্ণ লাইব্রেরি, ক্যাফেটেরিয়া, সদ্য নির্মিত কমনরুম, প্রায় ১০ বছর থেকে নির্মাণাধীন একটি ছাত্রী হল ও গবেষণা ইন্সটিটিউট। নেই কোনো আলাদা মেডিকেল সেন্টার ভবন, টিএসসি, অডিটোরিয়াম, গবেষণা সেন্টার, পর্যাপ্ত চিকিৎসার সুবিধা, ক্যাফেটেরিয়ায় নেই ভালো খাবার ব্যবস্থা, জিমনেশিয়াম, ল্যাব থাকলেও চালু নেই বিভিন্ন অনুষদে, মিডিয়া ল্যাব, পরিপূর্ণ গ্যারেজ, আলাদা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, হলগুলোতে প্রয়োজনীয় সেবা, পর্যাপ্ত ক্লাসরুম, শিক্ষক সংকট চরমে, লাইব্রেরিতে পর্যাপ্ত বই, সেই সঙ্গে নেই বসার মত জায়গা, শিক্ষার্থীদের বসতে হয় লাইব্রেরির বাইরে, ক্যাম্পাসের ভেতরেও নেই শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, কয়েকদিন পরপরই ক্যাম্পাসের আশেপাশে ঘটে ছিনতাই, ছুরিকাঘাতের মত ঘটনা, ক্লাসরুমে ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের তেমন কোনো সংশ্লিষ্টতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মারকও পূর্ণতা পায়নি একযুগেও, নেই স্থায়ী শহীদ মিনার। তাছাড়া যার নামে বিশ্ববিদ্যালয় সেই বেগম রোকেয়ার নামেই নেই কোনো ম্যুরাল কিংবা একাডেমিক কোর্স। যদিও প্রতিবছর আশ্বাস দেওয়া হয় এসবই সামনে হবে।
এদিকে মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে বছরের পর বছর আশ্বাস দিয়ে গেলেও এখনও কয়েক বছর থেকে তা ফিজিবিলিটি টেস্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। বারবার সবকিছুর মতই মাস্টারপ্ল্যানও পেছাচ্ছে।
এদিকে ১০ বছর আগে শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ কাজ শুরু হয় একটি ছাত্রীহল ও একটি রিসার্চ ইন্সটিটিউট এর। তৎকালীন একাধিক উপাচার্য ও তাদের সহযোগীদের দুর্নীতির ফলে বন্ধ হয়ে যায় এ সকল কাজ, যদিও পরে আরো দুইজন উপাচার্য আসলেও এখনও পর্যন্ত তার সমাধান ঘটেনি। কবে নাগাদ শিক্ষার্থীরা তা পাবে বলতে পারছে না কেউই।
ছাত্রসংসদ নিয়ে বারবার তারিখ করলেও তা এখনও আইনেই যুক্ত করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এদিকে ১৭ বছরে সমাবর্তন না পাওয়া শিক্ষার্থীদের ১ম বারের মত সমাবর্তনের ঘোষণা দিয়েও নানা সমালোচনা ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে আছে এর বাস্তবায়ন। সংশ্লিষ্টরা আশংকা করছেন নির্ধারিত তারিখেও হবে না সমাবর্তন। তাছাড়া ফাইল ট্রাকিং এ ডিজিটাল সেবা চালু করলেও অনিয়ম করতে তা বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র।
বিশ্ববিদ্যালয় জুড়েই দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছিলো বিদ্যুৎ বিভ্রাট, এ সমস্যা নিরাময়ে কয়েকবছর আগে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সেই কার্যক্রম এখনো চালু হয়নি।
মেডিকেল সেন্টারে ৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে আসছেন মাত্র ৪ জন চিকিৎসক সেটিও শুধু অফিশিয়াল পিরিয়ডে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও নেই তেমন উদ্যোগ, গত ৪ মাসে ৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
ক্লাসরুমে ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য ল্যাবগুলো অর্ধযুগ থেকেই রয়েছে বন্ধ। নেই পর্যাপ্ত টেকনিশিয়ান ও দক্ষ কর্মচারী।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই অডিটোরিয়াম ফলে নানা সময়ে দেখা গেছে বড় কোনো আলোচনা সভাই হয়নি। আবার এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন বরণ অডিটোরিয়ামের অভাবে করা হয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যারেজে, তা নিয়েও হয়েছিলো নানা সমালোচনা।
শিক্ষার্থীরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভাগীয় পর্যায়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর একজন শিক্ষার্থী হিসেবে যে সেবা ও সুবিধা গুলো পাওয়ার কথা ছিল তা আমরা পাইনি, আমাদের সিনিয়রাও পায়নি। তাছাড়া একটা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যে নূন্যতম কিছু অত্যাবশকীয় স্থাপনা প্রয়োজন সেগুলোও নেই। সব সরকার আমাদের সঙ্গে অন্যায় করেছে, আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তো সরকারের কাছে সেভাবে চাইতেও পারেনা যেন তারা সরকারের কাছে বন্দি।’
তবে সংকটের মাঝেও বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ১৭ বছরে যুক্ত হয়েছে নানা সাফল্য। এই দেড় যুগের কম সময়ে এসেই কয়েক বছর থেকে ধারাবাহিকভাবে চলছে সেশন জট বিহীন একাডেমিক কার্যক্রম। পরিবহন সেবা এ বছরে উন্নতি হয়েছে। গবেষণার উন্নয়নে শিক্ষার্থীদেরও দেওয়া হচ্ছে অনুদান। গবেষণায় বিশ্বসেরা ২% গবেষক হিসেবে প্রতিবছরই থাকছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা, সবুজে ঘেরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, তুলনামূলক পর্যাপ্ত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক কার্যক্রম প্রকাশ্যে বন্ধ রয়েছে, শিক্ষক রাজনীতিও রয়েছে বন্ধ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ বছরের পূরণে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রুশাইদ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা বিশ্ববিদ্যালয় করতে যতটুকু পরিকল্পনা ও সময় নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় নেওয়া হয় নাই। মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় রান করা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি, বিগত প্রশাসনগুলোর আমলে অব্যাহত অনিয়ম, দুর্নীতি আর লুটপাট হয়েছে। এই জন্য ১৭ বছর পেরিয়েও আমাদের এখানে আবাসিক সংকট, অডিটোরিয়াম সংকট বিরাজমান। ক্লাসরুম, শিক্ষক সংকটসহ গবেষণা খাতে বরাদ্দের মতো বিষয় নিয়েও একাডেমিক বহু সীমাবদ্ধতাও আছে। তবে বর্তমান প্রশাসন কিছুটা আশ্বাসের বাণী শোনাচ্ছে। দুয়েকটা ইতিবাচক পরিবর্তনও অবশ্য সামনে আসতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। দেখা যাক সামনে তা পূর্ণ হয় নাকি শুধুই আশার বাণী।’’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত রেজিস্টার বলেন, প্রতিষ্ঠার প্রায় শুরু থেকেই আমরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কাজ করে আসছি। ৬টি অভ্যন্তরীণ প্রশাসন দেখেছি। তবে একান্তই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে কাজ করবে এমন প্রশাসন একটিও পাইনি। এরা যদি বিশ্ববিদ্যালয়কে ধারণ করতো নিজের মনে করতো তাহলে এই বেহাল দশা হতো না।’’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষক বলেন, ১৭ বছরে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কিছুই পূর্ণতা পাওয়া সম্ভব। তবে কোরামবাজি, সরকারমহলের অনিহা ও সদিচ্ছার অভাবে আমাদের বেরোবির এই সংকটগুলো। আশা রাখি সকল সংকট খুব দ্রুত কাটিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নিবে প্রাণের এই প্রতিষ্ঠান।”
যেভাবে মায়ামির সর্বাধিক গোলদাতা হলেন মেসি
নেসকোর ওপর খেপলেন সারজিস আলম
টিভিতে আজ যেসব খেলা
আজ শেখ হাসিনা-কামালের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক, হবে সরাসরি সম্প্রচার
লিওনেল মেসির জোড়া গোলে মায়ামির দাপুটে জয়