আতঙ্কে এলাকা ছাড়ছে হামলার শিকার পরিবারগুলো 

  • খবর জানেন না ইউএনও
আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৫, ০১:৫১ এএম

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার এক কিশোরের বাড়িসহ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ১৩টি বসতঘরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। উপজেলার বেতগাড়ি ইউনিয়নের আলদাতপুর ছয়আনি গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভয়ে তাদের জিনিসপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হলেও, তারা নিরাপত্তার ব্যাপারে আশ্বস্ত না হয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে জিনিসপত্র নিয়ে চলে যাচ্ছেন।

গত শনিবার ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক কিশোরকে পুলিশ আটক করে। পরে রবিবার সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করে তাকে আদালতের মাধ্যমে শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। এ ঘটনা কেন্দ্র করে ওইদিন বিকালে স্থানীয় উত্তেজিত জনতা আলদাতপুর ছয়আনি হিন্দুপল্লীর ১৩টি বাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালায়। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

গতকাল সোমবার সকালে গ্রামে সরেজমিন গেলে দেখা যায়, গ্রামবাসী ও আশপাশের লোকজনের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। তারা গরু, ছাগল ও বাড়ির আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। এ সময় শংকর রায় নামে একজনের সঙ্গে কথা হয়।

তিনি বলেন, ‘আজও (সোমবার) স্থানীয় উত্তেজিত জনতা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালাতে পারে। তাই গরু-ছাগল নিয়ে আমার দিদির বাড়িতে রাখতে যাচ্ছি। রবিবারের ঘটনার পর আরও বেশি ভয় হচ্ছে। তারা পুলিশের সামনে আমাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। আজ যদি আগুন লাগায়, তাহলে কিছুই থাকবে না। তাই আগেভাগে আসবাবপত্রসহ সবকিছু সরিয়ে নিচ্ছি।’

ক্ষতিগ্রস্ত আরেক বাড়ির মালিক নারায়ণ মহন্ত বলেন, ‘যে অপরাধ করেছে, তাকে শাস্তি দিক। কিন্তু একজনের অপরাধের দায় কেন পুরো গ্রামবাসীর ওপর চাপানো হলো? আমি রাজমিস্ত্রির কাজ করে খাই, অনেক কষ্টে বাড়িটি সাজিয়েছি। তারা মানববন্ধন ও মিছিলের নামে এসে পুলিশের সামনে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। পুলিশ শুধু দাঁড়িয়ে দেখেছে, কেউ এগিয়ে আসেনি। আমাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর এত অত্যাচার কেন? আমরা চাই, এ ঘটনার সঠিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। শুনেছি, আজও তারা গ্রামে অগ্নিসংযোগ করতে পারে। তাই ভয়ে অবশিষ্ট জিনিসপত্র আত্মীয়দের বাড়িতে রাখতে যাচ্ছি।’

শুধু শংকর রায় ও নারায়ণ মহন্ত নন, ওই গ্রাম ও আশপাশের প্রায় ৫০টি পরিবার ভয়ে বাড়ি ছেড়ে জিনিসপত্র নিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। তাদের চোখেমুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো কয়েকটি স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হলে শনিবার সন্ধ্যায় পাশের এলাকা থেকে লোকজন এসে ওই কিশোরের বাড়ি মনে করে ভুলবশত অন্য একজনের বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। পরে আরেক দফায় হিন্দুপল্লীতে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। এতে ১৩টি পরিবারের ঘরবাড়ি তছনছ হয়। ঘটনাস্থলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অভিযুক্ত কিশোর (১৭) রংপুরের একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের তৃতীয় পর্বের শিক্ষার্থী। 

গঙ্গাচড়া মডেল থানার ওসি আল এমরান বলেন, ‘ওই কিশোর সামাজিকমাধ্যমে ধর্ম অবমাননাকর লেখা ও ছবি পোস্ট করেছে— এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তাকে তাৎক্ষণিক আটক করা হয়। সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করে আদালতের মাধ্যমে শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক।’

গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, ‘ঘটনাস্থলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। স্থানীয়রা শান্ত আছে, তবে নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার কিছু উত্তেজিত জনতা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে হামলার চেষ্টা করেছিল। প্রশাসনের সহযোগিতায় ৩০ বস্তা খাবার, ১৫ বান টিনসহ অন্যান্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।’

হিন্দুপল্লীর লোকজনের জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। সেখানে ২৪ ঘণ্টা পুলিশ, সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা উপস্থিত রয়েছেন। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত