গত জুলাই মাসে সারাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছিল বলে জানিয়েছে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সোমবার জুলাইয়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সংস্থার পাঠানো প্রতিবেদন বলা হয়, রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু, গণপিটুনিতে নির্যাতন ও হত্যা, সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও গুলিতে মৃত্যু বেড়েছে। এছাড়া বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, নারী নিপীড়ণ ও ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, শ্রমিকদের উপর হামলা, কারাগারে মৃত্যু, সভা-সমাবেশে বাধা প্রদানের মতো ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচিকেন্দ্রিক স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাথে যৌথ বাহিনীর সংঘর্ষে ও গুলিতে ৫ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে অনেক এলাকা পুরুষ শূন্য হয়ে পড়ে। নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছে। একইদিনে গোপালগঞ্জের পৌর পার্কে এনসিপির কর্মসূচি ভণ্ডুল করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দ্বারা হামলা, ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক কিশোরকে গ্রেপ্তারের পর সংগঠিতভাবে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত ২০টি বাড়িতে বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। এই হামলায় বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট এবং বহু পরিবারকে আতঙ্কিত করে এলাকা ত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিডফোর্ড) সামনে ৯ জুলাই জনসম্মুখে ব্যবসায়ী মো. সোহাগকে যেভাবে নির্মমভাবে পিটিয়ে, কুপিয়ে এবং শরীর থেঁতলে হত্যা করা হয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক, লজ্জাজনক এবং উদ্বেগজনক। এইচআরএসএস’র প্রতিবেদনে গত ২১ জুলাই ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধ প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জুলাই মাসে কমপক্ষে ৫৯ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় অন্তত ১৫ জন নিহত ও কমপক্ষে ৬৬১ জন আহত হয়েছেন। জুলাই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার সংখ্যা জুন মাসের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। গত জুন মাসে ৬৬টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ১২ জন এবং আহত হয়েছিলেন ৫৪৬ জন। জুলাই মাসে সহিংসতার ৫৯টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৩৪টি ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৩৭০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে ৭টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩৯ জন, বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ৫টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩৬ জন, বিএনপি-এনসিপির মধ্যে ৫টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন ৮২ জন। নিহত ১৫ জনের মধ্যে বিএনপির ৬ জন, আওয়ামী লীগের ৫ জন ও ইউপিডিএফের ৪ জন।
৫৯টি সহিংসতার ঘটনার ৫১টিই ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ও বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাইতে অন্তত ১৭টি হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ২৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে ৬টি হামলার ঘটনায় ২টি মন্দির, ২টি প্রতিমা, ২০টি বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া জমি দখলের মত একটি ঘটনাও ঘটেছে । এইচআরএসএস’র প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাইতে ‘মব’ সহিসতা ও গণপিটুনির অন্তত ৩২টি ঘটনায় কমপক্ষে ১২ জন নিহত ও ৩৯ জন আহত হয়েছেন।
এইচআরএসএস বলছে, জুলাইতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে, সংষর্ষে ও গুলিতে ৬ জন নিহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে যৌথবাহিনীর গুলিতে ৫ জন, এবং ১ জন পুলিশ হেফাজতে নিহত হয়েছেন। এছাড়া জুলাই মাসে কমপক্ষে ১৬২ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৬৮ জন, যাদের মধ্যে ৪২ জন (৬২%) ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু।
সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নামে কমপক্ষে ৩০টি মামলা হয়েছে। এ সকল মামলায় ১৬৫২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ১৭ হাজার ৮৩৭ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এ মাসে রাজনৈতিক মামলায় কমপক্ষে ৬১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী অন্তত ৫৮৭ জন। এছাড়া এ মাসে সারাদেশে পুলিশের বিশেষ অভিযানে আরও ৫ হাজার ৫০৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। গত ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় সন্ত্রাস বিরোধ আইনে এখন পর্যন্ত ১৫টি মামলায় ১৬ হাজার ২০৮ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানায় এইচআরএসএস।
