চোখের সামনে নদীতে তলিয়ে গেল শিরিনার শেষ সম্বল জমি

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৫, ০৪:৩৪ পিএম

“ছোটবেলা বাবা-মা মরছে। ৩২ বছর আগে স্বামীরে হারাইছি। অনেক কষ্ট কইরা মাইনষের বাসায় কাম করে থাকার জন্য ঐ টাকায় ছোট একটা ঘর করছিলাম। সেই থাকার জায়গাডা আর ঘরটাও চোখের সামনে নদীতে লইয়া গেলো। এখন আর কিছুই রইল না। সারা জীবনডা গেল দুঃখে দুঃখে।”

এভাবেই মনের দুঃখ-কষ্টের কথাগুলো বলছিলেন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার অছিম উদ্দিন মাদবর কান্দি এলাকার নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত শিরিনা বেগম (৭০)। 

ভাঙন কবলিত অছিম উদ্দিন মাদবর কান্দি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তপ্ত দুপুরে পদ্মা নদীর পাড়ে বসে পরিত্যক্ত ছেড়া জিওব্যাগ ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছেন শিরিনা বেগম। এ সময় কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর অন্যের বাসায় কাজ শুরু করি। তাই কাজের টাকায় স্বামীর রেখে যাওয়া জমিতে কোন রকমের একটি টিনের ঘর তোলেন তিনি। একমাত্র ছেলে বিয়ে করে ভিন্ন থাকায়, ঘরটিতে একা থাকতেন শিরিনা। সম্প্রতি সেই ঘর ও জমি পদ্মা নদীতে ধসে গেছে। তাই অন্যের ঘরে বসবাস তার। রাতে বিছিয়ে ঘুমানোর জন্য পরিত্যক্ত জিও ব্যাগ পানিতে ধুয়ে সংগ্রহ করছেন তিনি। নদী ভাঙ্গনে বাড়ি আর জমি রক্ষা করতে না পেরে কুড়ানো জিওব্যাগই তার আশ্রয়। তাই সরকারি ও সমাজের বৃত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করছি। 

পাশের উকিল উদ্দিন মুন্সী কান্দি এলাকার সোহেল মাদবর বলেন, মঙ্গলবার থেকে আমাদের গ্রামে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। আমাদের বাপদাদার যে সম্পদ ছিল সব নদীতে ভেঙে নিয়ে গেছে। বাড়িটুকুও  নদীতে ভেঙে যাচ্ছে। এখন থাকার মতো কোন যায়গা নেই। আমরা কোথায় গিয়ে দাড়াবো বুঝে উঠতে পারছি না। তাই সরকারের কাছে সহযোগিতা চাই। 

তাজুল মাদবর বলেন, জাজিরার নাওডোবা ইউনিয়নের পদ্মা সেতু কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড রক্ষা বাঁধের পাশেই ছিল আমাদের বাড়ি। কয়েক দফায় নদী ভাঙনে আমার ও আমার বংশের ২০ থেকে ২৫টি বসতঘর, কাচারিঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে তলিয়ে গেছে। সরকারের কাছে আমার দাবি, এখানে যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে টেকসই একটি বেড়িবাঁধ করে দেয়।

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুরের জাজিরার উপজেলার নাওডোবা ইউনিয়নের আলমখার কান্দি, উকিল উদ্দিন মুন্সী কান্দি, অছিম উদ্দিন মাদবর কান্দি ও পৈলান মোল্লা কান্দি এলাকায় কয়েক দফায় ভাঙনে ৩০০ মিটার এবং পদ্মা সেতু কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড রক্ষা বাধের ৫০০ মিটার পদ্মা নদীতে বিলীন হয়েছে। এদিকে ভাঙন বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার নাওডোবা ইউনিয়নের অন্তত ৬০০ পরিবার এবং মাঝিরঘাট বাজারের ২৪০টির বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিতে রয়েছে। এরইমধ্যে বিলীন হয়েছে ৫৭টি বসতবাড়ি ও ৩৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। 

শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তারেক হাসান বলেন, আমরা ভাঙন রোধে আপদকালীন কাজ করছি। কিন্তু পদ্মা নদীতে যেই স্রোত, ভাঙ্গন পুরোপুরি থামানো সম্ভব না। ভাঙ্গন প্রতিরোধের একটিই ব্যবস্থা, সেটি হলো স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তিনি বলেন, ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ডাম্পিং শুরু করেছি। জাজিরা উপজেলা ভাঙন কবলিত এলাকায় এই পর্যন্ত ১ লাখ ২৩ হাজার জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ডাম্পিং করা হয়েছে।  

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, জাজিরাতে কোথায় কোথায় খাস জমি রয়েছে তা খুঁজে বের করতে আমরা ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছি। যারা নদীতে সব হারিয়েছে তাদের তালিকা তৈরি করে সে সকল জায়গা দেওয়া হবে এবং যাদের জায়গা রয়েছে তবে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন তাদের জন্যও টিনসহ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া যে পরিবারগুলো ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের তালিকা তৈরি করে সহযোগিতা করা হবে। এরআগেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহযোগিতা করা হয়েছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত