শনিবার ড্যাবের ভোট: শেষ মুহুর্তের প্রচারণায় মুখর চিকিৎসক অঙ্গন

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৫, ০২:১৭ এএম

বিএনপিপন্থি চিকিৎকসকদের সংগঠন ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাবের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক অঙ্গন এখন মুখর। শেষমুহুর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত নির্বাচনে অংশ নেওয়া চিকিৎসকরা। দুটি প্যানেল হওয়ায় নির্বাচন জমে উঠেছে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তি প্রেক্ষাপট নির্বাচনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।  

এবার ড্যাবের দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রথম নির্বাচন হয় ২০১৯ সালে। তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। চিকিৎসক অঙ্গনে আওয়ামী লীগপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) দুর্দান্ত প্রতাপ। কোনঠাসা বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের তখন খারাপ সময়। ফলে সে সময় বেশ ঝুঁকি নিয়ে নির্বাচন করতে হয় ড্যাবকে। সে নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচিত হন এবারের ডা. হারুন-ডা. শাকিল প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ।  

ড্যাবের কমিটির মেয়াদ ৩ বছর। মাঝখানে করোনা থাকায় নির্বাচন হয়নি। ফলে এবার পাঁচ বছর পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

 চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ড্যাবের ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় নির্বাচন। আগামী শনিবার ৯ আগস্ট রাজধানীতে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে ঘিরে হাসপাতালগুলো সেজেছে রঙিন ব্যানার-ফেস্টুনে। ভোটের জন্য প্রার্থীরা ছুটছেন চিকিৎসকদের দ্বারে দ্বারে। চিকিৎসক অঙ্গনে এখন শুধুই ড্যাবের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা।   

এবছর নির্বাচনে দুটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। একটি প্যানেলের সভাপতি ও মহাসচিব পদে দাঁড়িয়েছেন যথাক্রমে অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ ও ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল। প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলে সভাপতি ও মহাসচিব প্রার্থী যথাক্রমে অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক ও অধ্যাপক ডা. আবদুস সাকুর খান। এর মধ্যে ডা. হারুন আল রশিদ ২০১৯ সাল থেকে ড্যাবের সর্বশেষ কমিটির নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। আর ডা. এ কে এম আজিজুল হক এর আগের ১৪ বছর অর্থাৎ ২০০৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ড্যাবের সভাপতি ছিলেন।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এবার নির্বাচনী মাঠে এখনো ডা. হারুন-ডা. শাকিল পরিষদ প্রতিদ্বন্দ্বী ডা. আজিজ-ডা. শাকুর পরিষদের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে নানামুখী নির্যাতনের সহ্য করেও রাজনীতিতে সক্রীয় ছিলেন এই প্যানেলের চিকিৎসকরা। এমনকি আগস্ট গণঅভ্যূত্থানে এই প্যানেলের চিকিৎসকদের ভূমিকাও অনস্বীকার্য বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। 

চিকিৎসকরা আরও জানিয়েছেন, দুই প্যানেলেই স্বচ্ছ ভাবমূর্তির চিকিৎসক রয়েছেন। তবে তরুণ চিকিৎসকরা ডা. হারুন-ডা. শাকিল পরিষদের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। অবশ্য নির্বাচনের শেষমুহুর্তে এসে দুই প্যানেল পরস্পরের বিরুদ্ধে বেশকিছু অভিযোগ তুলেছে। সর্বশেষ আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) ও বিএমইউ স্পেশালাইজড হাসপাতালে অনুষ্ঠিত দুই প্যানেল পরিচিতি ও মতবিনিম অনুষ্ঠানে প্যানেল দুটি এসব অভিযোগ তুলে ধরে।

ভোটারদের হুমকি-ধামকির অভিযোগ: ডা. হারুন-ডা. শাকিল পরিষদের সভায় ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি পদপ্রার্থী অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ, মহাসচিব পদপ্রার্থী ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, সিনিয়র সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান, কোষাধ্যক্ষ পদপ্রার্থী ডা. মেহেদী হাসান ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদপ্রার্থী অধ্যাপক ডা. একেএম খালেকুজ্জামান দিপু উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ড্যাবের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ বিএম‌ইউ এবং অন্যান্য শাখার নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় সভাপতি পদপ্রার্থী অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ বলেন, ডা. হারুন-ডা. শাকিল পরিষদ বিজয়ী হলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা ঘোষণার ২৬ দফার আলোকে সমৃদ্ধ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলব। বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে জাতীয়তাবাদী আদর্শের চিকিৎসকরা বঞ্চিত হয়েছেন উল্লেখ করে ভোটারদের উদ্দেশে এই সভাপতি প্রার্থী বলেন, “স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে যারা আপনাদের পাশে ছিলেন না, তারা ভোট চাইতে আসলে আপনারা উপযুক্ত জবাব দেবেন। ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে সে সমস্ত মানুষগুলোকে প্রতিহত করবেন।”

এ সময় ডা. আজিজ-ডা. শাকুর প্যানেলের প্রতি ইঙ্গিত করে তারা ভোটারদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন অধ্যাপক ডা. হারুন। তিনি বলেন, নির্বাচনে সুনিশ্চিত পরাজয় জেনে প্রতিপক্ষ প্যানেল নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

প্যানেল পরিচিতি সভায় মহাসচিব পদপ্রার্থী ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, আগামী ৯ আগস্টের নির্বাচনে নির্ধারণ হবে—ড্যাব কাদের নেতৃত্বে চলবে। আপনারা রাজপথের শক্তিকে নির্বাচিত করতে ভোট দিবেন। নির্বাচিত হলে ডা. হারুন-শাকিল প্যানেলের নেতৃত্বে পেশাভিত্তিক ও কর্মীবান্ধব ড্যাব উপহার দিবে।

এ সময় নির্বাচিত হলে ড্যাবের স্থায়ী কার্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন ডা. শাকিল। তিনি বলেন, বেসরকারি চাকরির বেতন-কাঠামো, নিয়োগ, পদোন্নতি এবং চাকরি স্থায়ীকরণ নীতিমালা প্রণয়নে হারুন-শাকিল পরিষদ কাজ করবে। সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে পদোন্নতি নীতিমালা প্রণয়নেও কাজ করবে এই প্যানেল।

ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকার অভিযোগ প্রতিপক্ষের: অন্যদিকে, বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে প্যানেল পরিচিতি অনুষ্ঠান শেষে সংবাদ সম্মেলন করে ডা. আজিজ-ডা. শাকুর পরিষদ। এই প্যানেলের সভাপতি পদপ্রার্থী অধ্যাপক ডা. একে এম আজিজুল হক, মহাসচিব অধ্যাপক ডা. আব্দুস শাকুর খান, সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা. সাইফ উদ্দিন নিসার আহমেদ তুষান, কোষাধক্ষ্য ডা. তৌহিদ উল ইসলাম জন ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদপ্রার্থী ডা. আবু মো. আহসান ফিরোজ। 

সংবাদ সম্মেলনে পরিষদ নেতারা বলেন, এই নির্বাচন সংগঠনের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চাকে আরো উৎসাহিত করবে। এ সময় কেন্দ্রীয় সম্মেলন প্রস্তুতি ও কাউন্সিল পরিচালনা কমিটির কাছে সরবরাহ করা সদ্য বিলুপ্ত কমিটির তালিকায় অনেক অসঙ্গতি রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। প্যানেল প্রার্থীরা জানান, ভোটার তালিকা থেকে ড্যাবের আজীবন সদস্য—এমন কিছু চিকিৎসকের নাম তালিকায় নেই। আবার মারা গেছেন—এমন চিকিৎসকদের নাম তালিকায় আছে। অন্যদিকে নতুন যে তিন শর মতো চিকিৎসক সদস্য হয়েছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন, যারা বিতাড়িত আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এমনকি গত বছরের ৫ আগস্টের পর কোনো নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত না করার কথা থাকলেও গোপনে পছন্দের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ‘স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া ও স্বাস্থ্যখাতকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে আমরা জনগণের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। বিএনপির রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফার আলোকে স্বাস্থ্য খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে, সবার জন্য স্বাস্থ্য ও সার্বজনীন চিকিৎসা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে চাই।

ভোটার ৩১৪৮, ভোট ৫ পদে: নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়েছে, ২৭১ সদস্যের ড্যাব কেন্দ্রিয় কমিটির মধ্যে এখন পাঁচটি পদে নির্বাচন হচ্ছে। এগুলো হলো- সভাপতি, মহাসচিব, সিনিয়র সহ-সভাপতি, কোষাধ্যক্ষ, ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। পরে নির্বাচিত এই পাঁচজ সদস্যের কমিটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি মনোনীত করবেন। 

কমিশন আরও জানায়, ৫ আগস্টের আগে হওয়া ড্যাব সদস্যরা ভোট দিতে পারবেন। ভোটার ৩ হাজার ১৪৮ জন। ২০১৯ সালে প্রথম ভোটের মাধ্যমে ড্যাব কেন্দ্রিয় কমিটি গঠন করা হয়। সেবার ডা. হারুন-ডা. শাকিল প্যানেলের ডা. হারুন আল রশীদ সভাপতি নির্বাচিত হন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচন হচ্ছে। এর আগে যারা নেতৃত্বে ছিলেন, তারা মনোনীত হয়েছেন, নির্বাচিত নন।

চিকিৎসকরা জানান, ড্যাব কেন্দ্রিয় কমিটির মেয়াদ ৩ বছর। কিন্তু মাঝখানে করোনা থাকায় মেয়াদ শেষ হলেও নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। ভোট কেন্দ্র রাজধানীর কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল এন্ড কলেজ প্রাঙ্গন। ভোট গ্রহণ দুপুর একটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত