১৬ বছর অনুপস্থিত থেকেও চাকরিতে ফিরছেন ৩ শিক্ষক

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৫, ০৬:৩২ এএম

গাজীপুরের কালিয়াকৈর সরকারি কলেজে দীর্ঘ ১৬ বছর এক দিনও ক্লাসে না গিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন বহিষ্কৃত তিন শিক্ষক। এই খবরে এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে অনুপস্থিতির তথ্য গোপন করে নানা তদবিরের মাধ্যমে গত সোমবার সকালে ওই তিন শিক্ষক কলেজে যোগদানের জন্য যান। তবে কৌশলগত কারণে সেদিন তাদের যোগদান করানো হয়নি।

কলেজ সূত্র জানায়, দুর্নীতির অভিযোগে ১৬ বছর আগে কালিয়াকৈর সরকারি কলেজের ভূগোল বিভাগের প্রভাষক মো. জাহাঙ্গীর আলম, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের প্রভাষক কিশোর কুমার সরকার এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রভাষক ফাতেমা পারভীনকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।

কলেজ কর্র্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৬ সালে এটি সরকারিকরণের পর নাম পরিবর্তন করে কালিয়াকৈর সরকারি কলেজ রাখা হয়। উপজেলার ফুলবাড়িয়া এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম ১৯৯৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভূগোল বিভাগের প্রভাষক হিসেবে এ কলেজে যোগ দেন। ২০০১ সালের অক্টোবরে এমপিওভুক্ত হয়ে তিনি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৪ সালের ১৮ জুন নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি উপাধ্যক্ষ পদে যোগ দেন এবং একই বছরের ২৩ জুন প্রভাষক পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

অফিসের তথ্য অনুসারে, তিনি ২০০৮ সালের ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত উপাধ্যক্ষ হিসেবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি কলেজে উপস্থিত থেকে কোনো কার্যক্রমে অংশ নেননি। বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ২০০৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কলেজ গভর্নিং বডি তাকে উপাধ্যক্ষ পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুসারে গঠিত তদন্ত কমিটি তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল করে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার প্রভাষক পদের এমপিওভুক্তিও বাতিল করা হয়। কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২৯ জুন জাতীয়করণের জন্য পরিদর্শনকালেও তিনি কলেজে উপস্থিত ছিলেন না। এরপর থেকে তিনি কখনোই কলেজে যাননি। দীর্ঘ সময় পর গত সোমবার তিনি যোগদানের জন্য কলেজে যান, কিন্তু যোগদান করতে পারেননি। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কলেজটি “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ” নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আমি শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করি। এ কারণে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক আমার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। দুদকে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। থানা, পুলিশ সুপার, জেলা দায়রা জজ আদালত এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়। একপর্যায়ে আমাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আমি এসব মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৪ সালে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর কিশোর কুমার সরকার মাত্র দুই মাস অনিয়মিতভাবে কলেজে উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির সময় তিনি নিয়মিত উপস্থিত হননি, ফলে তার এমপিওভুক্তি হয়নি। তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হলেও জবাব না দেওয়ায় পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুসারে তাকে প্রভাষক পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। গত সোমবার তিনিও জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কলেজে যোগদানের জন্য যান। কিশোর কুমার বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমরা নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হয়েছি।’

২০০৪ সালের ২৩ জুন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে অতিরিক্ত প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান ফাতেমা পারভীন। নিয়োগের পর থেকে তিনি কলেজে যাননি। পরিচালনা পর্ষদ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়। জবাব না দেওয়ায় ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী তাকে প্রভাষক পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ফাতেমা পারভীন বলেন, ‘আমাকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আমি বৈষম্যের শিকার। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাকে বৈধভাবে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’

কলেজের শিক্ষক ও কর্মচারীদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই তিন শিক্ষক কলেজে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত রেখেছিলেন। তারা কোনো ক্লাস বা পরীক্ষার কার্যক্রমে অংশ নেননি। গোপনে জাতীয়করণ তালিকায় তাদের নাম যুক্ত করা হয়। তথ্য গোপন করে তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চাকরি ফিরে পাওয়ার আবেদন করেন। গত ১ জানুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সফিউল বশর স্বাক্ষরিত এক পত্রে তিন শিক্ষকের অ্যাডহক নিয়োগ-সংক্রান্ত কাগজপত্রসহ অধ্যক্ষকে তলব করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষকরা জানান, বরখাস্ত হওয়া এই তিন শিক্ষক চাকরি ফিরে পাওয়ার জন্য সম্প্রতি আদালতে মামলা করেছেন, যা এখনো চলমান। এর আগেই তথ্য গোপন করে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অ্যাডহক নিয়োগের চেষ্টা করা হয়। গত ৩০ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কাজী নুরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক পত্রে ‘জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষক ও অ-শিক্ষক কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা ২০০০’ অনুযায়ী তিন শিক্ষককে অস্থায়ীভাবে ক্যাডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে কলেজের জনবল কাঠামো অনুযায়ী, জাহাঙ্গীর আলমের স্থানে বিসিএস ক্যাডার মো. হাবিবুল্লাহ এবং ফাতেমা পারভীনের স্থানে মোসা. রুবা ইয়াসমিন নিয়োগপ্রাপ্ত রয়েছেন।

কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোবারক হোসেন জানান, বরখাস্ত হওয়ায় তিন শিক্ষকের নাম বা পদ শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়নি। তবুও বিগত সরকারের সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে পদ সৃজন করা হয়। কলেজ কর্র্তৃপক্ষ তাদের অ্যাডহক নিয়োগ না দেওয়ার সুপারিশ করে।

কালিয়াকৈর সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব সিকদার বলেন, ‘আমি ২০১৭ সাল থেকে এই কলেজে আছি, এই আট বছরে তাদের একদিনও দেখিনি। তারা কবে এই কলেজের শিক্ষক ছিলেন? ২০১৬ সাল থেকে কলেজে না এসেও তারা এরিয়ার বিল পাবেন। কোটি কোটি টাকা কার টাকা? এটা জনগণের, শিক্ষার্থীদের টাকা। কিছু আওয়ামী লীগের সহযোগী এখনো কলেজে রয়ে গেছে, যারা আট বছর পর তাদের জন্য অবস্থান সৃষ্টি করছে। এই বৈষম্য, এই অন্যায় আমরা মেনে নেব না। আপনারা সাবধান হোন। আপনাদের স্বার্থ কী, আমরা জানতে চাই।’

কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সুফিয়া বেগম বলেন, ‘বরখাস্তকৃত তিন শিক্ষকের জন্য যে বিষয়গুলোতে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোয় বর্তমানে বিসিএস ক্যাডার শিক্ষক নিয়োগপ্রাপ্ত রয়েছেন। ফলে এই মুহূর্তে তাদের যোগদান করানোর কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে আমরা মন্ত্রণালয় ও মাউশিকে লিখিতভাবে জানাব।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাউছার আহাম্মেদ বলেন, ‘তিন শিক্ষকের যোগদানের বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলে আমি মনে করি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত