‘আজকে ১২ দিন পর্যন্ত বরিশালবাসী আন্দোলন করছে। কিন্তু বরিশালবাসীর কথা কি সচিবালয় পর্যন্ত পৌঁছায় না? বরিশাল কি একটা আলাদা দেশ?’ এমন প্রশ্ন রেখে বরিশালের রাজপথে চলমান আন্দোলনের ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন সংগঠক মহিউদ্দিন রনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা মেডিকেলের সামনে আন্দোলন করেছি। তবুও তারা কোনো সাড়া দেয়নি। আজ আমরা রাস্তা অবরোধ করেছি, সাময়িকভাবে মানুষ রাজপথে নেমেছে। বরিশাল পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে দিয়েছে মানুষ; তখন তারা কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে। কিন্তু সেটিও যথাযথ নয়। কর্তৃপক্ষ স্বয়ং আসেনি, বরং একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছে।’
রনি বলেন, ‘আমাদের এই আন্দোলন শুধুমাত্র শেবাচিম (শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) ঘিরে নয়। বরিশালবাসী এখন আন্দোলনে নেমেছে পুরো দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য। দেশের যতগুলো হাসপাতাল আছে, সেগুলোর অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম দূর করতে হবে।’
আট ঘণ্টা সড়ক অবরোধে স্থবির বরিশাল
গতকাল শুক্রবার সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। এতে বরিশাল শহরের ভেতরে ও বাইরের যান চলাচল দীর্ঘসময় অচল হয়ে পড়ে। চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা, রোগী ও সাধারণ মানুষ।
আন্দোলনের মুখপাত্র নাভিদ নাসিফ বলেন, ‘শেবাচিম কর্তৃপক্ষের একজন প্রতিনিধি এসেছিলেন। তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে, কিছুদিন পরে তারা মিটিংয়ে বসতে চান। কিন্তু আমাদের এই আন্দোলন কয়েকজন মানুষকে নিয়ে গঠিত নয়। এটি এখন বরিশালবাসীর আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে যেতে পারি না। এই আন্দোলনে যারা এখন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন, তাদের মতামতের ভিত্তিতেই আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি এবং সেই সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি। তিনি যেন শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে এসে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখেন এবং হাসপাতালের সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করেন।’
অগ্রগতি হচ্ছে, ধাপে ধাপে কাজ চলছে, দাবি হাসপাতাল পরিচালকের
এই আন্দোলন প্রসঙ্গে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যেদিন আন্দোলন শুরু করে তখন তাদের সাথে আমি আলাদাভাবে কথা বলেছি। এরপর তাদের সামনে হাসপাতাল সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরি। আমরা কী কী কাজ করেছি এবং সামনে কী কী করব। তখন তাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, তাদের বেশিরভাগ দাবি আসলে জাতীয় সমস্যা, যার মধ্যে অবকাঠামো সমস্যা, ডাক্তার সংকট, জনবল ঘাটতি সবই আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর আমি তাদের আবারও আমন্ত্রণ জানাই হাসপাতালটি ঘুরে দেখার জন্য। তিনদিন পর তাদের মধ্যে থেকে একটি তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল আসে, হাসপাতালটি ঘুরে দেখে এবং পরে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তারা আমাকে বলেন, ‘আপনি তো কাজ করছেন।’ এরপর তারা বলেন, ‘আপনার কাজ করুন, আর আমাদের কাজ আমরা করি।’ আমি তখন বলি, আন্দোলন করলে তো আমারও কাজ করতেও সুবিধা হবে। আমি আরেকটু শক্ত অবস্থানে গিয়ে অ্যাকশনে যেতে পারব।’
পরিচালক জানান, ‘চার তারিখে তারা আবার অবস্থান কর্মসূচি করে। সেদিন আমি আবারও তাদের সঙ্গে দেখা করি। তারা বলেছে, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তখন আমি বলি, আমি কীভাবে তাদের সহায়তা করতে পারি? তারা জানায়, মন্ত্রণালয় থেকে এখনো তাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি।’
‘আমি তাদের আশ্বাস দিই যে, চাইলে আমি মিনিস্ট্রি পর্যায়ে যোগাযোগ করতে পারি। এরপর আমি বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও উপদেষ্টার পিএস পর্যায়েও জানাই। একই সঙ্গে তাদের দাবি, সমস্যা ও আন্দোলনের পটভূমিও তুলে ধরি।’
মন্ত্রণালয় চেয়েছে চাহিদাপত্র
পরিচালক জানান, ‘এরপরে মন্ত্রণালয় থেকে জানতে চাওয়া হয়; এখনই জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালের জন্য কী কী প্রয়োজন। আমি দুটি ভাগে চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি।’
অবকাঠামোগত উন্নয়ন: ‘হাসপাতালের পুরাতন ভবন মেরামতের জন্য বাজেট চাওয়া হয়েছে। যেহেতু দীর্ঘদিন এখানে কোনো বড় ধরনের উন্নয়ন হয়নি, তাই ধাপে ধাপে এটি করতে হবে।’
সরঞ্জামাদি ও লজিস্টিক: ‘বেড, ট্রলি, অন্যান্য জীবন রক্ষা উপকরণ যা সংকটপূর্ণ, সেগুলোর চাহিদা জানিয়েছি। মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, প্রয়োজনে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হবে।’
দালাল সিন্ডিকেটের প্রসঙ্গে পরিচালক বলেন, ‘হঠাৎ করে দালালের বিরুদ্ধে গেলে বড় একটা ভ্যকুয়াম তৈরি হতে পারে। সেটা ধাপে ধাপে ইরেগুলার পদ্ধতিতে সরাতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছে, ট্রলিতে রোগী তুললেই টাকা দাবি করা হয়। আমি বিষয়টি আমলে নিয়েছি এবং অ্যাকশনে গিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘দালাল সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্যকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। এছাড়াও হাসপাতালে সামনে যেসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গজিয়ে উঠেছে। এদের বেশিরভাগ জেলা পরিষদের জমিতে গড়ে উঠেছে।’
অবরোধস্থলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সক্রিয় ছিল। মেট্রোপলিটন এয়ারপোর্ট থানার ওসি জাকির হোসেন সিকদার বলেন, ‘নথুল্লাবাদ এলাকায় যেন বিশৃঙ্খলা না হয়, সেজন্য আমরা উপস্থিত ছিলাম। জনদুর্ভোগের বিষয়টি আন্দোলনকারীদের বারবার বিবেচনায় নিতে অনুরোধ করেছি।’
তবে আন্দোলনের ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর থেকে এখনো কেউ সরাসরি বরিশালে এসে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেননি, যা নিয়ে রয়েছে তীব্র অসন্তোষ।
আন্দোলনের মুখপাত্র নাভিদ নাসিফ বলেন, ‘এটি এখন বরিশালবাসীর আন্দোলন। আমরা স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপ চাই। তিনি বরিশালে এসে নিজের চোখে পরিস্থিতি দেখুন।’
বরিশালের এই আন্দোলন এখন আর কেবল স্থানীয় চাহিদা নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটি জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যখাতের জবাবদিহি, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও মানবিক চিকিৎসা সেবার দাবি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি ও জনগণের প্রত্যাশার এই ব্যবধান কত দ্রুত ঘুচবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
