চরমে পৌঁছেছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট। প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক অনুপাত খুবই কম। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগেই রয়েছে শিক্ষক সংকট। তবে এই সংকটের মধ্যেও শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম, বোর্ড ও ইউসিজির অনুমোদন নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা ও বিতর্ক।
বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে এক্সপার্ট নির্বাচন এবং ইউজিসির অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
অভিযোগ উঠেছে, ভুল তথ্য দিয়ে পদোন্নতি ও চাকরি স্থায়ী করা শিক্ষককে করা হয়েছে বোর্ড এক্সপার্ট। এমন ব্যাপক সমালোচনার মুখে মৌখিকভাবে স্থগিতও হয়েছে নিয়োগের জন্য নির্ধারিত বোর্ডটি।
জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দুইজন শিক্ষক শিক্ষাছুটিতে থাকায় গত এপ্রিল মাসে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। অন্যান্য কার্যক্রম শেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগামী রবিবার (১৭ আগস্ট) নিয়োগ পরীক্ষা ও বোর্ডের তারিখ ও সময় নির্ধারণ করে।
অভিযোগ উঠেছে, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ওই শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে এক্সপার্ট হিসেবে রাখা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষককে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলির ইচ্ছেমত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে রাখতেই এমন পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। তিনি এই বোর্ডে বাইরের দু’জন এক্সপার্ট রেখেছেন, যার মধ্যে একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
এছাড়া ইউজিসির আদেশ অমান্য করে অনুমোদন ছাড়াই নিজেদের চাহিদামত শিক্ষক নিয়োগের জন্য তৎপর বলেও অভিযোগ।
উল্লেখ্য, ইউজিসি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে গত ২৮ মে একটি পরিপত্র জারি করেন। যাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অনুসরণীয় গাইডলাইন উল্লেখ আছে এবং পরিপত্রের ৪১ নম্বর পয়েন্টে স্পষ্ট বলা আছে, ‘বাজেট বরাদ্দ অব্যাহত রাখার স্বার্থে শিক্ষা ছুটির বিপরীতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাছুটি সংক্রান্ত নীতিমালা ও কমিশনের পূর্বানুমোদন অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।’
যদিও প্রশাসন ও উপাচার্য বলছেন ভিন্ন কথা।
এ বিষয়টিকে সামনে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা বলেন, ‘যেখানে স্পষ্টভাবে ইউজিসি শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে অনুমোদন নেওয়ার কথা বলেছে সেখানে কীভাবে তারা শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছেন এগুলো ভাবলে সন্দেহ তৈরিই হয়। তাছাড়া বোর্ডে যাকে রেখেছেন তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে। ওই এক্সপার্ট তো জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক, ভুল তথ্য দিয়ে তার পদোন্নতি ও স্থায়ীকরণ করে নিয়েছেন।’
অভিযোগকারীরা আরও বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক অভিযোগ দিয়েছেন যার প্রেক্ষিতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর চিঠিও দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি নীল দলের সদস্যও ছিলেন। তাহলে তাকে রেখে কি বুঝানো হচ্ছে? কেনই বা ইউজিসির পরিপত্র মানছেন না তারা?’
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট, বিভাগে চলমান রেগুলার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বারবার শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে দাবি জানিয়ে আসছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা।
সম্প্রতি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দু’জন শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে গেলে এরই পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষক সংকট দেখা দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগটিতে এবং তারা শিক্ষক সংকট নিরসনের দাবি করে বলে জানা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্যতম ফার্স্ট ডিপার্টমেন্ট যারা করোনাকে মোকাবিলা করেও চারবছরের মধ্যেই স্নাতক সম্পন্ন করতে পেরেছি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজটের যে মহড়া ছিল তা কাটিয়ে উঠতে শতভাগ সক্ষম হয়েছে এই বিভাগ।
তবে সম্প্রতি একাধিক শিক্ষক শিক্ষা ছুটির কারণে থাকায় একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে; তার ওপর জুলাই অভ্যুত্থানে বন্ধ থাকায় একটা গ্যাপও হয়েছিল। এসব কাটিয়ে উঠতে তো শিক্ষকদের ভূমিকা প্রয়োজন, যদি শিক্ষকই কম থাকে তাহলে কীভাবে সম্ভব? যা কিছুই হোক দ্রুত আমরা শিক্ষক চাই বিভাগে।
প্রশাসন থাকা কর্মকর্তা ও দায়িত্ব পাওয়া শিক্ষকেরা বলেন, ‘যেখানে আমরা চাচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সমস্যা না থাকুক। সেখানে তারা ষড়যন্ত্র করছে যেন বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে পড়ে এবং এই প্রশাসন ব্যর্থ হয়। এসব ভাবনা চিন্তা তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতির কারণ।’
তারা আরও বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রম তো দীর্ঘদিনের কিন্তু এক্সপার্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও ইউজিসির পরিপত্র তো এসেছে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও এক্সপার্ট সিলেক্টের পরে। যারা এসব নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে তারা কখনো বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থিতিশীল দেখতে চায় না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. হারুন অর রশীদের কাছে এসব নিয়ে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আসলে যে শিক্ষক নিয়ে কথা হচ্ছে উনি তো তার স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেনই সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে।
তাছাড়া বোর্ড স্থগিতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি মূলত এখনো পর্যন্ত মৌখিকভাবে স্থগিত রয়েছে। রবিবারের আগ পর্যন্ত তো আর লিখিত আদেশ সম্ভব না। এ নিয়ে রবিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
শিক্ষকদের শিক্ষা ছুটি, নিয়োগ বোর্ড ও ইউজিসির অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মির্জা আমিরুন নেছা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষক শিক্ষাছুটিতে আছে এটা ঠিক, নিয়োগের বোর্ড গঠন হয়েছে। তবে এক্সপার্ট এর বিষয়টা তো প্রশাসন জানে, আমি জানি না।’
তিনি আরো বলেন, ‘ইউজিসির অনুমোদনের বিষয়টা তো আমরা কোনো লিখিত চিঠি পাইনি বা মৌখিকভাবেও জানানো হয়নি। এটা জানি না, প্রশাসন জানবে এসব বিষয়ে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিজ পছন্দের যে বিষয়টা এসেছে সেটা আসলে ভিত্তিহীন। কেননা এক্সপার্ট সিলেকশন করে পাশ হয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। এটা মূলত তারা কেন বলছে জানি না। তাছাড়া এক্সপার্টের বিষয়ে তার পূর্বের রাজনৈতিক পরিচয়ের কথা এসেছে, পূর্বে কি করেছে এটা তো আমি জানি না। আমরা দেখেছি তিনি জুলাই অভ্যুত্থানে সাহসিকতা দেখিয়েছেন, তার ভূমিকা আমরা দেখেছি। অথচ এখন তার পূর্বের পরিচয় আনা হলো।’
এ সম্পর্কে উপাচার্য আরো বলেন, ‘সিন্ডিকেট বোর্ড এক্সপার্ট ঠিক করেছে ৫-৬ মাস আগে আর তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ হয়েছে কিছুদিন আগে। আবার তিনি তো একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত এবং স্নাতক, স্নাতকোত্তর করেছেন সমাজবিজ্ঞান থেকেই আমরা তো সে হিসেবে তাকে রেখেছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘ইউজিসির যে বাজেট বরাদ্দের বিষয় সেটার সাথে শিক্ষক নিয়োগের কি সম্পর্ক? এই পরিপত্র দেওয়া হয়েছে চলতি বছরের ২৮ মে তারিখে কিন্তু আমরা বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি তার এক মাস আগে এপ্রিলে। তাহলে ভুলটা কোথায়? তাছাড়া এই পরিপত্রের পর তো আমরা লিখিত পাঠিয়েছি, এই আগস্টে সিদ্ধান্ত আসবে। আমরা তো এখনো নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করিনি, সিন্ডিকেট তো হবে পরে।’
এ সম্পর্কে জানতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি সাড়া দেননি।
