মৌটুসি-ফুলটুসি

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৫, ০৩:১৬ এএম

এক ছিল মৌমাছি। যেমন তার কণ্ঠ ছিল মধুর মতো মিষ্টি তেমনি সে মধু খেতেও ভালোবাসত খুব। তাই মা-বাবা আদর করে তার নাম রেখেছে মৌটুসি। ভারি সুন্দর মেয়ে! মিষ্টি সুরে গাইতে জানে। ফরফরিয়ে নাচতে জানে। দুষ্টুমি আর লুকোচুরিতেও ভারি পাকা সে। এত কিছু পারলে কী হবে, মেয়েটি যে খুব অলস! সারা দিন হাঁপুস হয়ে পড়ে থাকবে মৌচাকে। উড়বে না। ঘুরবে না। নিজের কাজটাও সে নিজে করবে না। ফুলবাগিচায় মধু সংগ্রহ করতেও যাবে না সে। তাই মা-বাবা তার ওপর খুব রাগ করে।

কত বড় হয়েছে মেয়েটা! এত অলস হলে কি আর চলবে? মা-বাবার হোটেলে আর কতদিন এভাবে বসে বসে খাবে শুনি? মধু সংগ্রহ করতে হবে না বুঝি! মা মৌমাছিটি বলল ফিসফিসিয়ে। মৌটুসির তখন খুব মন খারাপ হলো। টুপ করে উড়াল দিল মায়ের কোল থেকে। উড়ে গিয়ে জুড়ে বসল বাবার কোলে। আর বলল, ‘বারে! আর একটু বড় হতে দাও না আমায়! তারপর না হয় যাব ফুলবাগিচায়! কাঁড়ি কাঁড়ি মধু কুড়াব। পেট ভরে খাব। আর জমিয়ে রাখব মৌচাকে।’

আমি বুঝি খুব বড় হয়ে গেছি? উড়তে জানি ভালো? এত অল্প বয়সে কেউ মধু সংগ্রহে যায়? এত দীর্ঘ পথ উড়ে কীভাবে যাব আমি ফুলবাগিচায়? আমার কষ্ট হবে না বুঝি! গড়গড়িয়ে বলল মৌটুসি।

মেয়ের অমন কথা শুনে অবাক হলো বাবা মৌমাছিটি।

মাকে বলল, মৌটুসি তো ঠিকই বলেছে। আর একটু বড় হলে তারপরই না হয় সে যাবে মধু সংগ্রহ করতে। মা মৌমাছিও তখন কিচ্ছুটি বলল না ও-কে।

এরপর কেটে গেল অনেক দিন। মৌটুসিও অনেক বড় হলো। কিন্তু সে আগের মতোই অলসই থেকে গেল। বদলায়নি একটুও। এখনো সে যায় না মধু সংগ্রহে।

উড়ে না ফুলে ফুলে। মা একদিন রেগে গিয়ে বললেন, ফুলবাগিচায় যেতে। মৌটুসি বলল, আর একটু বড় হই। তারপর না হয় যাব।

মা বললেন, ইস আর কত বড় হতে চাও তুমি? জলদি চল ফুলবাগিচায়।

বাবা মৌমাছির আর ভাল্লাগে না এসব। তাই একদিন ডাকল মৌটুসিকে। কোলে নিয়ে আদর করে বলল, কিরে মা? ফুলটুসির সঙ্গে দেখা করতে হবে না বুঝি? ওর সঙ্গে খেলতে হবে না? ওকে তোর মধুর সুরে গান শোনাবি না? বাবার কথায় অবাক হলো মৌটুসি। জিজ্ঞেস করল, ফুলটুসি আবার কে বাবা? সে তুই চিনবি কী করে? ফুলটুসি হলো রঙিন এক প্রজাপতির নাম। ভারি সুন্দর মেয়ে সে। ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায়। মিষ্টি করে গান গায় আর নাচে হেলেদুলে। তুই কি যাবি ওর কাছে?

মৌটুসি বলল, বা রে! যাব না আবার! পারলে আজই আমায় নিয়ে যাও ওর কাছে। কোথায় থাকে ফুলটুসি? বাবা তখন মাথা নিচু করল। তারপর বলল, সে তো অনেক দূর মা! ওই দূরের ফুলবাগে থাকে সে। রোজ রোজ আমরা যেখানে মধু সংগ্রহে যাই। সেখানেই তো ফুলটুসিদের বাড়ি!

মৌটুসি মুচকি হেসে বলল, বেশ তো! কাল থেকে আমিও যাব তোমাদের সঙ্গে। ফুলটুসির সঙ্গে দেখা করব। আর মনভরে মধু সংগ্রহ করব। করব না আর অলসতা। থাকব না আর ঘুমিয়ে। নিজের কাজ করব নিজে। তখন তার মা-বাবা দুজনই খুব খুশি হলো। দুই গালে দুই চুমু এঁকে দিল মৌটুসির। তারপর তাকে নিয়ে উড়ে গেল ফুলবাগানে।

বেশ কিছুক্ষণ উড়ে উড়ে তারা পৌঁছে গেল কাক্সিক্ষত স্থানে। মৌটুসি দেখল ফুলটুসি উড়ছে ফুলে ফুলে। নাচছে দুলে দুলে। তারপর মা-বাবা মৌটুসিকে ফুলটুসির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। মৌটুসির মতো বান্ধবী পেয়ে ফুলটুসিও ভীষণ খুশি হলো। তাকে আপন বোনের মতো কাছে টেনে নিল।

দীর্ঘসময় বসে বসে দুজনে গল্প করল। মৌটুসিকে পুরো বাগান ঘুরিয়ে দেখাল ফুলটুসি। রঙবেরঙের ফুলের নাম শেখাল। কারণ মৌটুসি তো আগে কখনো এসব ফুল দেখেনি। নামও জানত না এগুলোর। তাই খুশি মনে সেও ফুলটুসির কাছে শিখল অনেক কিছু। ফুলটুসি তাকে আরও শেখাল কী করে ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করতে হয়। মধু সংগ্রহ করা শিখে মৌটুসির সে কী আনন্দ! এই মধু সংগ্রহের জন্য তার কত যে বকা শুনতে হয়েছে মায়ের কাছে! সারাদিন ঘুরাঘুরি আর মধু সংগ্রহের পর বিকেলবেলা মৌটুসি ফুলটুসির কাছ থেকে বিদায় নিল। ফুলটুসি ছাড়তে চাইল না তাকে। বলল, রাতটুকু থেকে যাও না আমার কাছে? মৌটুসি ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, আগামীকাল আবার আসব তোমার কাছে। আজ না হয় আসি। তা না হলে আবার মা-বাবা কষ্ট পাবেন।

পরদিন সকালে মৌটুসি আবার মা-বাবার সঙ্গে ফুলবাগানে গেল। সারা দিন ফুলটুসির সঙ্গে ঘুরল, ফিরল। মিষ্টি সুরে গান গাইল, পাখা নাড়িয়ে নাচল দুজন। আর পেট ভরে মধু খেল। কিছু মধু সঙ্গে করে নিয়েও গেল মৌটুসি।

এখন মা-বাবা মৌটুসির ওপর খুব খুশি। কারণ তাদের মেয়ে আগের মতো অলসতা করে না আর। সে এখন অন্যদের মতোই কর্মঠ। রোজ সকালে তাকে আর ডাকতে হয় না বরং সে এখন নিজেই আগে আগে জেগে ওঠে। আর জাগিয়ে তোলে মা-বাবাকেও।

ফুলবাগানে যেতে এবং মধু সংগ্রহ করতে এখন তার আর খারাপ লাগে না। ফুলবাগানই তার পছন্দের জায়গা। তার নিত্যদিনের সাথি হলো ফুলটুসি। রোজ সকালে দেখা হলেই ফুলটুসি আর মৌটুসি ছড়া কাটে

লেখক : শিক্ষার্থী, দশম শ্রেণি, আওলাকান্দি ই এম উচ্চ বিদ্যালয়, সারিয়াকান্দি, বগুড়া

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত