পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়ার শর্তে অবশেষে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ স্থাপনের প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। একনেকে অনুমোদন হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু করতে হবে। মূলত পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে এ শর্ত দেওয়া হয়। এ প্রকল্পটিসহ ১১টি প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক। এগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৭ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রকল্প ঋণ ২ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা, বাকিটা সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন।
গতকাল রবিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে একনেক সভা হয়। একনেক সভা শেষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরেন। রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ৫১৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের মে মাস থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের বুড়ি পোতাজিয়ায় ১০০ একর জমিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে এ প্রকল্প নেওয়া হয়। এর আগে গত মে মাসে প্রকল্পটি পাসের একনেকে উঠেছিল, তখন তা আবার পর্যালোচনার জন্য ফেরত পাঠানো হয়।
তবে পরিবেশবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, প্রকল্প এলাকাটি চলনবিলের শেষ অংশে অবস্থিত। এখানে মিলিত হয়েছে শতাধিক খাল, বিল, বড়াল নদসহ অর্ধশতাধিক নদীর পানি। এসব উৎস থেকে আসা পানির সম্মিলিত প্রবাহ গিয়ে মিলিত হয় যমুনা নদীর সঙ্গে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস নির্মাণ করা হলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রকল্প এলাকাটি চারণভূমি ছিল। ২০১৮ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় অকৃষি জমি হিসেবে ছাড়পত্র দিয়ে ভূমি অধিগ্রহণে অনাপত্তি সনদ দেয়। তখন বলা হয়েছিল, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র নিতে হবে। এখন সেই শর্ত পূরণের শর্ত দিয়ে প্রকল্পটি পাস করা হয়। তিনি আরও বলেন, এ নিয়ে পরিবেশবিদদের অনেক কথা আছে। এখন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার। তারা পুরো বিষয়টি মূল্যায়ন করবে।
একনেক বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্প প্রস্তাবনা একনেক সভায় উপস্থাপন করা হলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আপত্তি তোলেন। এ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়। পরিবেশ উপদেষ্টা নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন। পরে কয়েকজন উপদেষ্টা বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার শর্তে আপাতত একনেকে প্রকল্পটি পাস হোক। পরিবেশ ছাড়পত্র নিতে দুই মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা ও একনেক চেয়ারপারসন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, অনুমোদনের জন্য উপস্থাপিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি নতুন প্রকল্প, তিনটি সংশোধিত প্রকল্প এবং ব্যয় না বাড়িয়ে মেয়াদ বাড়ানোর তিনটি প্রকল্প।
সভায় অন্যদের মধ্যে অংশ নেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, জ¦ালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও কর্মকর্তারা।
সভায় কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহায়ন, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ ও স্থানীয় সরকার খাতের প্রকল্পগুলো স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিদ্যমান শিল্পসমৃদ্ধ এলাকায় ৩৩/১১ কেভি আউটডোর উপকেন্দ্র আধুনিকায়ন ও ক্ষমতাবর্ধন প্রকল্প; শিল্প মন্ত্রণালয়ের কেরু অ্যান্ড কোং (বিডি) লিমিটেডের শিল্প এলাকার বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের আধুনিকায়ন প্রকল্প; স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় সিলেট, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপন প্রকল্প; গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ঢাকার আজিমপুর সরকারি কলোনির অভ্যন্তরে কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ (জোন-সি) প্রকল্প; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ; স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই (তৃতীয় সংশোধিত) এবং বান্দরবান পৌরসভা ও জেলার তিন উপজেলা সদর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্প; ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্প এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্প।
