চীনের জন্মহারে করুণ দশা

সাংহাইয়ের একটি স্কুলে ২২ শিক্ষার্থীর জন্য ২৩ জন শিক্ষক

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৫, ০৭:১২ পিএম

চীনের সাংহাইয়ের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলতি বছর মাত্র ২২ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ায় তা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই চিত্র দেশটিতে জন্মহারে করুণ দশা ফুটিয়ে তুলেছে যার নজিরবিহীন প্রভাব পড়েছে শিক্ষা ব্যবস্থায়।

সাংহাইয়ের পুডং নিউ এরিয়ায় অবস্থিত সাংকিয়াও প্রাইমারি স্কুলে বর্তমানে শিক্ষার্থীর চেয়ে শিক্ষক বেশি। বিদ্যালয়টিতে ২২ জন শিক্ষার্থী ও ২৩ জন পূর্ণকালীন শিক্ষক রয়েছেন। অথচ স্কুলটি চীনের সবচেয়ে বড় শহরগুলোর একটিতে অবস্থিত। এই তথ্য স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ভর্তি-সংক্রান্ত ডেটা থেকে জানা গেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

তথ্যটি প্রথমে এপ্রিলে প্রকাশিত হলেও চলতি সপ্তাহে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ভাইরাল হয় এবং দেশে জনসংখ্যা হ্রাস কীভাবে স্কুলগুলোকে প্রভাবিত করছে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

যদিও সাংকিয়াওয়ের অবস্থা চরম উদাহরণ, জন্মহারের দেশব্যাপী পতনের কারণে ইতোমধ্যেই চীনে বিপুল সংখ্যক প্রাক প্রাথমিক স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। তবে এর নেতিবাচক প্রভাব এখন ক্রমশ প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও দেখা দিচ্ছে।

২০২৪ সালে চীনে কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ২০ হাজারের বেশি কমে গেছে এবং ৫০ লাখের বেশি শিশু আগের তুলনায় কম ভর্তি হয়েছে বলে সরকারি পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে।

পুডং জেলা সরকারের ছাত্র ভর্তি ও পরীক্ষা কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা স্কুলের তথ্যটি সঠিক বলে নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, প্রতিটি স্কুল কেবল তাদের নির্ধারিত ক্যাচমেন্ট এলাকা (ভর্তি-যোগ্য ভৌগোলিক অঞ্চল) থেকে শিক্ষার্থী নিতে পারে। সাংকিয়াওয়ের ক্ষেত্রে সেই এলাকায় ভর্তি বয়সী শিশু আসলেই এই পরিমাণেই আছে।

সাংকিয়াওয়ের শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার আরও একটি কারণ হিসেবে ওই স্কুলের ক্যাচমেন্ট এলাকায় থাকা কয়েকটি আবাসিক কমিউনিটি সম্প্রতি ভেঙে ফেলা এবং বাসিন্দাদের স্থানান্তর করাকে দেখানো হয়েছে।

সাংহাই শিক্ষা কমিশনের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ লাখ ৭১ হাজার—যা গত শিক্ষাবর্ষের তুলনায় ৩০ হাজার অর্থাৎ প্রায় ১৫ শতাংশ হ্রাস।

আরেকটি চীনা মেগা সিটি গুয়াংজুর সরকারি তথ্যেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৪ সালে সেখানে মোট ২ লাখ ৪০ হাজার ১০০ জন শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩২ হাজার ৪০০ জন বা প্রায় ১২ শতাংশ হ্রাস।

২০১৬ সালে পরিবার পরিকল্পনা আইন পরিবর্তন করে সব দম্পতিকে দুই সন্তান নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার পর চীনে জন্মহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। কিন্তু এরপর থেকে তীব্র পতন ঘটে। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুসারে, ২০১৬ সালে প্রতি হাজারে জন্মহার ছিল ১৩ দশমিক ৫৭, যা ২০২৪ সালে নেমে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৭৭-এ।

যদিও সাংকিয়াওয়ের ঘটনাটি অনেক বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ শিয়ং বিংচি বলেছেন জন্মহারের পতনের প্রভাব বর্তমানে মূলত কিন্ডারগার্টেনে বেশি অনুভূত হচ্ছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নয়।

২১শ শতকের শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক শিয়ং বলেন, নবজাতক সংখ্যা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা হ্রাসের পূর্ণ প্রভাব আগামী বছর থেকে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে ভর্তি অবশ্যই কমবে, তবে এর সমাধান হবে ছোট আকারের ক্লাস, যাতে শিক্ষার্থীদের ভিন্নতা আরও ভালোভাবে সামলানো যায়।

শিয়ং মনে করেন, ২০–২৫ জনের একটি ক্লাসই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু তার হিসাবে বর্তমানে জাতীয় গড় শ্রেণির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩৮ জন এবং জুনিয়র হাই স্কুলে ৪৬ জনে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত