চীনের মহান নেতা মাও সে তুং যখন ক্ষমতায় আসেন— তখন সমগ্র বিশ্বে চীনের পরিচয় ছিল একটি অনুন্নত ও দারিদ্রপীড়িত দেশ। চীনকে নতুনভাবে নির্মাণ করতে শুরু করেছিলেন তিনি, যার ধারাবাহিকতায় আজকের চীন। তিনি ছিলেন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা সংগ্রামের মহানায়ক। চীনের কৃষিজীবী মানুষকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি পার্টির শাসন ব্যবস্থার নীতিনির্ধারণ করেছিলেন। তার রাষ্ট্রনীতি চীনকে বদলে দিয়েছে।
গণচীনের বিপ্লবী নেতা মাও সে তুংকে, আধুনিক চীনের রূপকার ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকারের চেয়ারম্যান এবং আমৃত্যু কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। আজকের বিশ্বে তিনি বিবেচিত হন একজন কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক হিসেবে। তার দর্শনই ‘মাওবাদ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। জীবদ্দশায় পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের যেমন আদর্শে পরিণত হয়েছিলেন, তেমনই নানা মহলের তীব্র সমালোচনারও শিকার হয়েছিলেন। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পরেছিলেন। ২৪ বছর বয়সে রাজধানী পিকিংয়ে মার্কস তত্ত্বের মাধ্যমে কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে, সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া মাও, নিজ প্রচেষ্টায় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যানের শীর্ষ পদে দায়িত্বে পৌঁছান। পরবর্তীকালে সফলভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের রাষ্ট্রনায়ক হন।
উনিশ শতকের গোড়ার দিকে, চীন কিং রাজতন্ত্রের দুঃশাসনে বুঁদ ছিল। জনসাধারণ রাজতন্ত্রে অতিষ্ঠ হয়ে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলে। সেই আন্দোলনের অন্যতম নেতা সান ইয়াত সেনের সঙ্গে যোগ দেন মাও সে তুং। সফল হয় গণআন্দোলন । চীন মুক্তি পায়, কিং রাজতন্ত্রের দুঃশাসন থেকে। তরুণ বয়স থেকেই মাও সে তুং বামপন্থি রাজনৈতিক ধ্যানধারণার অনুসারী হয়ে পড়েন। ১৯১৯ সালে চীনকে আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যে, চীনের বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে একটি আন্দোলন চলছিল। সে আন্দোলনে তিনি ভূমিকা রাখেন লেখনীর মাধ্যমে। ১৯২০ সালের দিকে একজন মার্কসবাদী হিসেবে, চীনা রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯২৫ সালে জন্মগ্রাম শাওশানে কৃষক সংগঠন গড়ে তোলেন মাও।
কউমিঙটাঙ দলের নেতা কট্টর প্রতিক্রিয়াশীল চিয়াং কাই সেক, কমিউনিস্টবিরোধী দমননীতি শুরু করলে মাও সে তুং হুনান প্রদেশের কৃষকদের নিয়ে সৈন্যবাহিনী গঠন করেন। এই বাহিনী নিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নিলেও, পরাজিত হন। পরে চীনের দক্ষিণের পার্বত্য এলাকা জিয়াংজি প্রদেশে চলে যান মাও। এ সময়ে অসংখ্য তরুণ দলে দলে মাও নিয়ন্ত্রিত কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিতে শুরু করে। মাও সে তুং তাদের সশস্ত্রভাবে সংগঠিত করেন। ইতিহাসে এই সশস্ত্র দলটি রেড আর্মি নামে পরিচিতি পায়। তাদের লক্ষ ছিল, কৃষকের মুক্তি। আর সে লক্ষ্য অর্জনে অভিনব গেরিলা যুদ্ধের পথ অনুসরণ করে তারা। ১৯৩৪ সালে চিয়াং কাই শেক চীনের জিয়াংজি প্রদেশ ঘিরে ফেলে। তবে বিস্ময়কর ও অপ্রতিরোধ্য গতিবেগে সে বেড়াজাল ছিন্ন করে, রেড আর্মিকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন মাও সে তুং। এর পর তিনি শুরু করেন এক দীর্ঘ পদযাত্রা। যা ইতিহাসে লং মার্চ হিসেবে পরিচিত।
১৯৩৭ সালে চীন-জাপান যুদ্ধ শুরু হলে পরস্পরবিরোধী জাতীয়তাবাদী নেতা চিয়াং কাই শেকের ন্যাশনাল পার্টি এবং মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি ঐক্যবদ্ধভাবে আগ্রাসী জাপানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে ১৯৪৫ সালে জাপান পরাজিত হয়। তারপর চীনে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। এ গৃহযুদ্ধে জয়ী মাও সে তুং চীনের বিশাল ভূখন্ডে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। স্বৈরশাসক কাই শেককে পরাস্ত করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন মাও। ১৯৪৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মাও স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। তিনি এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এ পদে বহাল ছিলেন।
১৯৪৯ সালে সমাজতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি চীন শাসন করেন। শাসনকালে তিনি চীনকে একদলীয় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিণত করেন। চীনের শিল্পকারখানা, রাষ্ট্রীয় মালিকানায় আনেন। ‘মার্কসবাদী ও লেনিনবাদী’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি, কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় নিজের তত্ত্বও কাজে লাগান। ১৯৪৯ সালে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। একইসময় কমিউনিস্ট পার্টিকে একমাত্র দল হিসেবে বাস্তবায়ন করেন। ভূমি সংস্কারের কাজে তাকে শক্তিশালী বিরোধিতার মুখে পড়তে হয় ভূস্বামীদের। কিন্তু নিজ দক্ষতা ও সাংগঠনিক ক্ষমতাবলে এ ক্ষেত্রেও তিনি সফলতার পরিচয় দেন। কিছু ক্ষেত্রে তাকে বিতর্কিত করা হলেও তিনি নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা প্রসারের মতো আরো কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে চীনকে এক সময় পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ শক্তিতে পরিণত করেন।
চীনের কৃষিজীবী মানুষকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি পার্টির শাসন ব্যবস্থার নীতিনির্ধারণ করেছিলেন। মাওয়ের রাষ্ট্রনীতি চীনকে বদলে দিয়েছিল। সর্বজনীন আধুনিকায়ন, দ্রুত গতিতে শিল্পায়ন এবং গণশিক্ষার ব্যাপক অগ্রগতিতে মাও সে তুং বিশাল অবদান রেখেছেন নিঃসন্দেহে। কেবল জনগণই হচ্ছেন বিশ্ব ইতিহাস সৃষ্টির চালিকা শক্তি । তিনি বলেছেন, “জনগণের ধারণাকে সংগ্রহ করুন, সেসবকে সুসংবদ্ধ করুন এবং তারপর সেই সব ধারণা নিয়ে জনগণের কাছে যান।”
মাও সেতুং-এর সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার অন্যমত দিক ছিল উদারনৈতিকতা। সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় অনুপ্রারিত মাও সে তুং উদারনৈতিক মানসিকতার অধিকারী ছিলেন। মার্কসবাদে ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছা প্রকাশের কোন সুযোগ নেই। কিন্তু মাও সে তুং বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ দিয়ে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনায় নতুন প্রাণস্পন্দন নিয়ে আসেন।
মাও সে তুং ও মওলানা ভাসানী দু’জনেই মহান নেতা ছিলেন। দুজনের মধ্যে অনেক মিল ছিল। আধুনিক চীনের জন্মদাতা মাওকে তারা আজো শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। কিন্তু আমাদের দেশে মওলানা ভাসানীর মত মহান নেতাকে সেভাবে স্মরণ করা হয় না। মাও সে তুং শুধু বিপ্লবী নেতা নন, তিনি নেতাদের নেতা ছিলেন। তার কারণেই আজকে চীন নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছে। সেদেশে সমাজতন্ত্রের সাম্য প্রতিষ্ঠায় তার অবদান চিরস্মরণীয়। পৃথিবী কাঁপানো বিপ্লবী মহান নেতা মাও সে তুং ১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। ৪৯তম প্রয়াণ দিনে তাকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
[email protected]
