ডিসকর্ডের ‘অনলাইন ভোটে’ নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৯:৫১ এএম

নেপালের রাজনৈতিক সংকটের অবসান ঘটিয়ে দেশটির সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি শপথ নিয়েছেন নতুন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। গত শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি ভবন শীতল নিবাসে প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পাওডেল তাকে এ দায়িত্বে শপথ পড়ান। এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রধান বিচারপতি, সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা। কার্কিই হচ্ছেন নেপালের ইতিহাসে প্রথম নারী যিনি প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাহী প্রধানের দায়িত্ব পেলেন।

জেন-জি বিক্ষোভের জেরে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির পদত্যাগের পর এ পদটি শূন্য ছিল। তবে এই সংকট কাটাতে অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখেছে অনলাইন চ্যাট প্ল্যাটফর্ম ‘ডিসকর্ড’। শুধু আন্দোলন পরিচালনাই নয়, এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেই অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান কে হবেন, তা নির্ধারণে ভোটাভুটিও করা হয়।

এ বছরের শুরুতে নেপাল সরকার নতুন একটি আইন প্রণয়ন করে। এ আইন অনুযায়ী, ফেসবুক, গুগল, টিকটকসহ সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মকে নিবন্ধন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু প্ল্যাটফর্মগুলো এ শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানায়। একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘নেপো কিডস’ প্রচারণা তীব্র আকার ধারণ করে। নেপাল সরকার আইন অমান্যের অভিযোগে ফেসবুক, এক্স ও ইউটিউবসহ ২৬টি প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেয়।

এ সিদ্ধান্তের ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জমে থাকা অসন্তোষ বিস্ফোরিত হয় এবং তারা রাস্তায় নেমে আসে। ফেসবুক ও টিকটকের মতো জনপ্রিয় মাধ্যমগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্দোলনকারীরা যোগাযোগের জন্য ডিসকর্ড ও রেডিটের মতো অপেক্ষাকৃত কম নজরদারিতে থাকা প্ল্যাটফর্মগুলো বেছে নেয়।

ডিসকর্ড মূলত একটি অনলাইন চ্যাট ও ভয়েস প্ল্যাটফর্ম, যা শুরুতে তৈরি করা হয়েছিল অনলাইন গেমারদের জন্য। এ প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীরা সার্ভার বা চ্যানেল তৈরি করে টেক্সট, অডিও বা ভিডিওর মাধ্যমে আলোচনা করতে পারেন। তবে এখন শুধু গেমারদের মধ্যেই এটি সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বজুড়ে নানা গ্রুপ, সংগঠন, শিক্ষার্থী, আন্দোলনকারী ও কমিউনিটি সদস্যরা এটি ব্যবহার করছেন।

নেপালের জেন-জি বিক্ষোভে ‘ইয়ুথ এগেইনস্ট করাপশন’ নামের একটি ডিসকর্ড সার্ভার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আন্দোলনের সময় কিছুদিনের মধ্যে সার্ভারটির সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এ সার্ভারে কর্মসূচি ঘোষণা, ফ্যাক্ট-চেক, মাঠের খবর, জরুরি হেল্পলাইন ও সাধারণ আলোচনার জন্য আলাদা আলাদা চ্যানেল ছিল, যা আন্দোলনকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্দোলনকারীরা সার্ভারটি ব্যবহার করে প্রতিবাদ কর্মসূচি সমন্বয় করতেন। এমনকি নেপালের প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ ও আন্দোলনকর্মীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইভ সেশনে অংশ নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতেন।

কে পি শর্মা অলির পদত্যাগের পর যখন রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, তখন আন্দোলনকারীরা ডিসকর্ডেই বিভিন্ন সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনার পর একটি অনলাইন পোল বা ভোটের ব্যবস্থা করে। এ পোলে ৭ হাজার ৭০০টির বেশি ভোট পড়ে, যার মধ্যে ৬২ শতাংশেরও বেশি ভোট পান সুশীলা কার্কি। চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগে কার্কি ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়ায় ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিরা সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করে তাদের পছন্দের কথা জানায়। শেষ পর্যন্ত কার্কিকেই অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ পড়ানো হয়। কাঠমান্ডুর জনপ্রিয় মেয়র বালেন শাহসহ আরও কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থী আলোচনায় থাকলেও চূড়ান্তভাবে কার্কির নামেই ঐক্যমত তৈরি হয়।

সুশীলা কার্কি ছাড়াও এই অনলাইন ভোটে আরও বেশ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছিল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন শাহ, তরুণ রাজনীতিবিদ সাগর ঢাকাল, ধারান শহরের মেয়র হার্কা সামপাং, সামাজিক উদ্যোক্তা মহাবীর পুন ও নেপালের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের প্রধান কুলমান ঘিসিং।

মেয়র বালেন শাহর ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকলেও তিনি নিজে এই পদের জন্য আগ্রহী ছিলেন না। তিনিও কার্কিকেই সমর্থন দেন। এতে সাবেক প্রধান বিচারপতির নির্বাচিত হওয়ার পথ আরও সহজ হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত