মিয়ানমারে সামরিক জান্তার নৃশংসতা রুখতে জাতিসংঘের তৎপরতা দাবি

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:৩০ এএম

মিয়ানমারে সামরিক জান্তার নৃশংসতার বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে জাতিসংঘকে আহ্বান জানিয়েছেন সংস্থাটিতে নিযুক্ত দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত কিয়াও মো তুন। 

গত বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি মিয়ানমারের বর্তমান মানবিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। চিঠিতে তিনি সামরিক জান্তার ওপর অস্ত্র, জ্বালানি ও অর্থ প্রবাহ বন্ধের জন্য জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদকে চাপ প্রয়োগের অনুরোধ জানান।

চিঠিতে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত মিয়ানমারে ৭ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ২৯ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর ফলে, সাড়ে ৩৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং ২২ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। দেশটির অর্ধেক জনগোষ্ঠী এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।

রাষ্ট্রদূত কিয়াও মো তুন তার চিঠিতে উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সামরিক জান্তা ৩ হাজার ৪০২টি বিমান হামলা চালিয়েছে, যার ফলে সারা দেশে ৩ হাজার ৬৮৯ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে ১০৪টি গণহত্যায় ১ হাজার ৬৯ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ১৯৫ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৩১৪ জন নারী। 

এর বাইরেও, একই সময়ে ৫ হাজার ১৯২টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৬৬টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ১ হাজার ৪৪টি সম্পত্তি ধ্বংস, ৬৩৪টি জোরপূর্বক শ্রম, ৩৫৯টি নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং ২২৬টি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঘটনা। এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও যুদ্ধাপরাধের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

চিঠিতে কারাগারগুলোতে রাজনৈতিক বন্দীদের ওপর চালানো নৃশংস নির্যাতনের বর্ণনাও রয়েছে। সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, সামরিক জান্তা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে নির্যাতন, ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্যের অভাব সৃষ্টি এবং প্রাণঘাতী নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। হপা-আন কারাগারে রাজনৈতিক বন্দীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। সেখানে ১২ জন রাজনৈতিক বন্দীকে লোহার শেকলে বেঁধে নির্জন কক্ষে আটকে রেখে ব্যাপক মারধর করা হয়, যার ফলে গত ১৩ জুলাই কো নিয়ান মিন তুন নামের একজন মারা যান।

কারাগারে অতিরিক্ত বন্দী, অপ্রতুল খাবার ও পানির রেশন ব্যবস্থার কারণে বন্দীরা চরম দুর্দশার মধ্যে রয়েছেন। অনেক বন্দীকে ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতেও অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

চিঠিতে কারাবন্দী স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তার ছেলে কিম আরিস জানিয়েছেন, গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত হলেও সু চিকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে না। মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) সু চি সহ সকল রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছে।

রাষ্ট্রদূত কিয়াও মো তুন আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি)-কে মিয়ানমারের কারাগারগুলোতে বন্দীদের অবস্থা খতিয়ে দেখতে এবং দুর্দশাগ্রস্ত রাজনৈতিক বন্দীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অনুরোধ করেন।

তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের জনগণ ৫৫ মাসের বেশি সময় ধরে সামরিক জান্তার অমানবিক ও নৃশংস বর্বরতার শিকার হচ্ছে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদকে আর দেরি না করে এখনই সাহসী ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

চিঠির শেষে তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সামরিক জান্তাকে বিচ্ছিন্ন করা এবং অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম ও জেট ফুয়েল সরবরাহ বন্ধ করা সম্ভব। এতেই মিয়ানমার আবার গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসবে এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত