বেপরোয়া প্রকৌশলীরা!

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৪৭ এএম

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) প্রকৌশল দপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন ভৌত ও অবকাঠামো নির্মাণ কাজে অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি প্রকৌশলীরা জড়িয়ে পড়ছেন। অভিযোগ রয়েছে, বারবার অভিযোগ উঠলেও প্রশাসন ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। ইচ্ছাকৃতভাবে কাজে ধীরগতি করে ধাপে ধাপে বিল বাড়ানো, বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করে পছন্দের লোককে কাজ পাইয়ে দেওয়া ও নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে ঘুরেফিরে বারবার কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে দপ্তরটির স্বয়ং উপ-প্রধান প্রকৌশলী মুরশীদ আবেদিনের বিরুদ্ধে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, প্রকৌশল দপ্তরের নামে অভিযোগ থাকলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ফলে তারা দুর্নীতি অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়টিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের দাবি, বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনকে দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।

সম্প্রতি মেসার্স এন রহমান এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের অজ্ঞাতে ওই প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র ও সিল ব্যবহার করে কাজ সম্পন্ন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকৌশল দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স) মামুন অর রশিদ এর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রে রিফিল করার জন্য ১২০৪ কেজি এবিসি ড্রাই পাউডার সরবরাহের কাজ দেন বিল্লাল নামে এক ব্যক্তিকে। তবে কাজের বিষয়টি জানতেন না প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিক নাজিউর রহমান সুজন। অথচ তার প্রতিষ্ঠানের নামেই এক লাখ নব্বই হাজার সাতশত তেরো টাকার বিল বিল্লাল নাজিউর নামে স্বাক্ষর করে গত ২১ সেপ্টেম্বর উত্তোলন করে নেন।

অভিযোগ করে নাজিউর রহমান সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো কোনো কাজ করিনি। শুধু এনলিস্ট করার জন্য কাগজপত্র ও সিল জমা দিয়েছিলাম। আমার অজান্তে আমার প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কাজ করা অন্যায়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে এমন অনিয়ম একেবারেই আশা করিনি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিল্লাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি নাজিউর রহমানের পক্ষে চেক নিয়েছি। প্রকৌশল দপ্তরের এক ভাই লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করেছেন।’ তবে মালিক কিছু জানেন না এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।

প্রকৌশল দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স) মামুন অর রশিদ বলেন, ‘বিল্লাল কাজ করেছে। তার প্রতিষ্ঠান না থাকায় ওই লাইসেন্স ব্যবহার করেছে। এর সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে তিনি জানান।’ তবে মালিককে না জানিয়ে তার কাগজপত্র অন্য কাউকে কিভাবে দিল এমন প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

এর আগে দপ্তরটির উপ-প্রধান প্রকৌশলী মুরশীদ আবেদিনের বিরুদ্ধে তার নিজের ও ঘনিষ্ঠদের মালিকানাধীন তিনটি প্রতিষ্ঠানই ঘুরেফিরে নিয়মিত কাজ পেয়ে আসছে বলে অভিযোগ উঠলেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য এখনো চলছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ধারা এন্টারপ্রাইজ, আমেনা কনস্ট্রাকশন এবং এমএস মাকিন ট্রেডার্স। এমএস মাকিন ট্রেডার্স প্রতিষ্ঠানটি মুরশীদের ভাতিজার নামে হলেও এর নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই। আমেনা কনস্ট্রাকশনের মালিক আওলাদ হোসেন মনু।

জানা গেছে, বর্তমানে এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মুরশীদ আবেদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকে কাজ পাইয়ে দিচ্ছেন। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যের অফিসের ওয়াশরুম এবং তৃতীয়তলার কয়েকটি রুম মেরামতের জন্য মেসার্স মাকিন ট্রেডার্সের নামে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার ৫৩৭ টাকা টাকার কাজের বিল নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রেজা শরীফের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, এই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করে ছাত্রদলের ববি শাখার এই সাবেক সভাপতিকে কাজ দিয়েছেন মুরশীদ আবেদিন। এ দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র মাঠের সংস্কার কাজে অনিয়ম পাওয়ায়  উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম সংস্কার কাজটি স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও মাঠের কাজ শেষ হয়নি।

এ বিষয়ে উপ-প্রধান প্রকৌশলী মুরশীদ আবেদিনকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। তার অফিসে গেলে তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। আপনারা আমাকে কাগজপত্র দিয়ে সাহায্য করতে পারেন। আমি বিষয়গুলো অবজার্ভ করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত