দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কোনো কমিটি নেই। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা-ক্ষোভ ও বিভাজন তৈরি হয়েছে। পদ-পদবি না পেয়েও অনেক নেতাকর্মী ক্ষুব্ধ এবং কমিটি না থাকায় অনেকেই পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করছেন। অথচ বছরখানেক আগেও শেখ হাসিনার পতনের দাবিতে সক্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলো।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে হেনস্তার ঘটনায় বিএনপির সাংগঠনিক সক্ষমতায় নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এজন্য বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকনকে দায়ী করছেন অনেকেই।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কয়েকজন নেতা জানান, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হলেও আজ তাদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই।
এদিকে আট মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ব্যানারে কোনো কর্মসূচি পালন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে বিএনপি। গত ১৭ জানুয়ারি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়, যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপিতে তোলপাড় চলছে। যদিও নেতাকর্মীদের দাবি, এই নিষেধাজ্ঞা কাদের বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে। এখানে দলীয় শৃঙ্খলা কিংবা কোনো ধরনের নিয়ম ভঙ্গের মতো কিছু ঘটেনি। নেতাকর্মীরা শুধু চলমান কর্মসূচি দলীয় ব্যানারে পালন করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে আনোয়ার হোসেন খোকন বলেন, আমার নিজস্ব কোনো বলয় নেই, সবাই বিএনপির লোক। যুক্তরাষ্ট্র অনেক বড় দেশ। এখানে এক স্টেট থেকে অন্য স্টেটে যেতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। আগে নিউইর্য়কভিত্তিক রাজনীতি হতো। এখন পর্যন্ত ১৮ স্টেট কমিটি দিয়েছি। কোথাও অনৈতিক কিছু কেউ দেখাতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্র শাখা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ডা. মজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ যখন কেউ কথা বলতে পারেনি তখন আমরা কথা বলেছি। কিন্তু স্টেট ও মহানগর কমিটি দেখে নেতাকর্মীরা হতাশ। বিগত সময়ের ত্যাগী ও নির্যাতিতদের মূল্যায়ন করা হয়নি। গ্রুপিং-কোন্দলের কারণে কয়েকবার কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীরা কয়েকটা ব্যানারে বিভক্ত হয়ে কর্মসূচি পালন করছেন। সাবেক সভাপতি সম্রাট, সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান, শরাফত হোসেন বাবু—তিনটি ব্যানারে কার্যক্রম পালন করে আসছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালের পর বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকনকে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়ার পর জুমের মাধ্যমে তিন স্টেট ও মহানগরের নামে আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়।
তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শাখা বিএনপির বিভিন্ন গ্রুপ বিচ্ছিন্নভাবে কর্মসূচি পালন করছে। বছরখানেক আগে বিশেষ করে নিউইয়র্ক স্টেটে পাতানো নির্বাচন দিয়ে চরম আঞ্চলিকতা প্রতিষ্ঠা করেন আনোয়ার হোসেন খোকন। প্রতিটি স্টেট ও মহানগরের আহ্বায়ক কমিটি কমিটিতে ২০ থেকে ২৫ জন করে তার অনুসারী এবং ভোটার ও প্রার্থী সবই তার। অথচ দেড় যুগ ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপি করা লোকদের স্থান হয়নি। বিশেষভাবে নিউইয়র্ক স্টেট কমিটিতে কুমিল্লা, সিলেট ও বরিশাল, চট্টগ্রামের লোকজন স্থান পেয়েছেন। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই কর্মসূচিতে অনুপস্থিত থাকেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন আন্দোলনে বহির্বিশ্বে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির নেতাকর্মীদের ভূমিকা ছিল নজিরবিহীন। গত ১৫ বছর অনেকেই বাংলাদেশে আসতে পারেননি। অনেকের পরিবার মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ১ বছর পার হলেও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি গঠনের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। সর্বশেষ ২০০৫ ও ২০১১ সালে আব্দুল লতিফ (সম্রাট) ও জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে কমিটি দেওয়া হয়, যা ২০১১ সালে ভেঙে দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের পর তারেক রহমান কয়েকবার কমিটি গঠনের ব্যাপারে আলোচনা ও লন্ডনে বৈঠক করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। আর আনোয়ার হোসেন খোকনকে কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি আরও স্থবির হয়েছে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অনেক বড় দেশ। তাই সেখানে বিভিন্ন স্টেট কমিটির মাধ্যমে বিএনপি চলছে। তারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। বিগত দিনে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে জোরালো ভূমিকা পালন করেছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে সেন্ট্রাল কোনো কমিটি থাকবে না।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতা ও নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. মিজানুর রহমান মিল্টন ভূঁইয়া বলেন, বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির যারা বেশি সক্রিয় ছিল তাদের আজকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ‘বিএনপি করতে পারবে না’—এই কথা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বা খালেদা জিয়াও কখনো বলেননি। নেতাকর্মীরা তো দল ও দেশের জন্যই কর্মসূচি পালন করছে। দেশের সংকট এখনো কাটেনি। তাই যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্র শাখা বিএনপির শক্তিশালী কমিটি গঠন করা জরুরি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফোরাম যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিএনপির সিনিয়র নেতা মোতাহার হোসেন বলেন, গত ১৫ বছর নিউইয়র্কে বিএনপির নেতাকর্মীরা যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ব্যানারে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের দাবিতে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আন্দোলন করেছে। একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ-নির্বাচনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। কিন্তু বিশেষ একজন ব্যক্তিকে আমেরিকার কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেওয়ায় দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান উপলব্ধি করতে পারছেন না। সুতরাং দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কমিটি গঠন অত্যন্ত জরুরি।
দলের চেয়ারপারসনস ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজারি কমিটির বিশেষ সহকারী বদরুল আলম চৌধুরী শিপলু বলেন, দলের কোন নেতা কোথায় কী করেন তার সব খবর তারেক রহমানের কাছে আছে। কখন কোথায় কী সিদ্ধান্ত নিতে হবে তা তিনি ভালো করে জানেন। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিশ্বের প্রায় সব দেশে বিএনপির অনেক কমিটি করা হয়েছে, এটা তো সহজ কাজ নয়। কোনো কাজের ভালোমন্দ উভয় দিকই থাকে। দিনশেষে ঐক্যবদ্ধ থাকাটা আমাদের মূল কথা।
