আকার অনুযায়ী ইলিশের দাম নির্ধারণের সুপারিশ ট্যারিফ কমিশনের

  • স্থানীয় বাজারে বড় ইলিশের কেজি ৩ হাজার টাকা
  • প্রতি কেজি ইলিশ রপ্তানি হচ্ছে ১৫৩৩ টাকায়
  • ৪-৬টি ধাপে ইলিশ হাতবদল হয়, মূল্য বাড়ে ৫৯-৬০ শতাংশ
  • প্রতি কেজি ইলিশের সর্বোচ্চ আহরণ খরচ ৮৪৭ টাকা
আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:০৮ পিএম

স্থানীয় বাজারে এ বছর ইলিশ বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। দামটা এতই অস্বাভাবিক যে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অথচ এ বছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে যে দামে ইলিশ রপ্তানি হচ্ছে তার দাম স্থানীয় বাজারের তুলনায় অর্ধেক। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে কম দামে ইলিশ রপ্তানি করলেও স্থানীয় বাজারে এর চড়া দাম নিয়ে। এই রহস্য খুঁজতেই ইলিশ ধরা থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত কিভাবে দাম বাড়ছে তা একটি সমীক্ষার মাধ্যমে তুলে এনেছে বাংলাদেশ ট্রেড এন্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। ইলিশের দামের এই ‘অত্যাচার’ থেকে ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে ওজন অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

ইলিশের উপর তৈরি করা এই প্রতিবেদনটি বাণিজ্য এবং মৎস ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠিয়েছে কমিশন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেড় কেজি বা তারও বেশি ওজনের একেকটি ইলিশের প্রতি কেজির মূল্য ছিল ২৮০০-৩০০০ টাকা। এক কেজি থেকে দেড় কেজি ওজনের প্রতি কেজি ইলিশের গড় মূল্য ২৫০০-২৬০০ টাকা। আর ৭৫০ গ্রাম থেকে ১ কেজি সাইজের প্রতি কেজি ইলিশের মূল্য ১৫০০ টাকা এবং আধা কেজি থেকে ৭৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ১২০০-১৪০০ টাকা।

অথচ গত বছরের আগস্টে দেড় কেজি বা তারও বেশি ওজনের প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১৮০০-২০০০ টাকায়। এক থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১৬০০-১৮০০ টাকায়। ৭৫০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের ইলিশের কেজি ১১০০-১১৫০ টাকা, ৫০০-৭৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি বিক্রি হয়েছে ৮০০-১০০০ টাকায়।

কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাজারে ৩ হাজার টাকা কেজি দরে ইলিশ বিক্রি হলেও এ বছর ভারতে প্রতি কেজি ইলিশের রপ্তানি মূল্য ১৫৩৩ টাকা। এই মূল্যে এ বছর এখন পর্যন্ত ৯৭.৩৬ মেট্রিক টন ইলিশ ভারতে রপ্তানি হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিদ্যমান রপ্তানি মূল্যে যদি ব্যবসায়ীরা মুনাফা করতে পারেন, তাহলে স্থানীয় বাজারের মূল্যে ব্যবসায়ীরা উৎপাদন মূল্যের (সংগৃহীত মূল্য) তুলনায় অস্বাভাবিক হারে মুনাফা করছেন। অস্বাভাবিক দামে ইলিশ বিক্রির একটি তুলনাও তুলে ধরেছে ট্যারিফ কমিশন। যেসব জেলেরা ইলিশ ধরেন তারা তিন ধরনের নৌকা ব্যবহার করেন। ছোট নৌকায় যারা ইলিশ ধরেন তাদের প্রতি কেজি ইলিশের মোট খরচ পরে ৮১৩ টাকা, মাঝারি নৌকায় প্রতি কেজি ইলিশের মোট খরচ ৮৪৭ টাকা এবং বড় নৌকায় ধরা ইলিশের সামগ্রিক খরচ পড়ে ৮২৮ টাকা। অথচ খুচরা বাজারে এই ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে।

কমিশন বলছে, সাধারণভাবে ৪-৬ স্তরে (হাতবদল) ইলিশ মাছ গ্রাহকের কাছে পৌঁছে। প্রতিটি স্তরে ইলিশের মূল্য বেড়ে যায় ৫৯-৬০ শতাংশ পর্যন্ত। এর ফলে জেলেরা প্রাথমিক পর্যায়ে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে ভোক্তাকে চূড়ান্তভাবে-এর ভার বহন করতে হয়।   

ট্যারিফ কমিশন ইলিশের দাম বাড়ার পেছনে ১১টি কারণ চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো- চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা, মজুত ও সিন্ডিকেট, জ্বালানি তেল ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, মাছ ধরার খরচ বৃদ্ধি, নদীর নাব্যতা সংকট ও পরিবেশগত সমস্যা, অবৈধ জালের ব্যবহার, দাদন, বিকল্প কর্মসংস্থান, নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও রপ্তানির চাপ। এর মধ্যে চাহিদা ও যোগানের মধ্যে ভারসাম্যের ক্ষেত্রে অনেক সময় কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন ব্যবসায়ীরা। এজন্য তারা ইলিশের অবৈধ মজুদ গড়ে তোলেন।

এ বিষয়ে ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মইনুল খান গনমাধ্যমে জানান, সরেজমিন সমীক্ষায় দেখা যায়, ইলিশ মাছ প্রায় শতভাগ দেশীয় পণ্য হলেও বাজারে এর দামের পেছনে কৃত্রিমতার সংযোগ রয়েছে। কেননা ইলিশ আহরণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা ডলারের উঠা-নামার তেমন প্রভাব নেই। সমীক্ষায় চিহ্নিত মূল জায়গা হলো আহরণ পরবর্তী সময়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের নানা স্তর ও তাদের অতিরিক্ত মুনাফা।

তিনি আরও বলেন, মূলত দাদন ব্যবসায়ীদের কারসাজি এর পেছনে বেশি ভূমিকা রাখছে মর্মে উঠে এসেছে। সমীক্ষায় এসব স্তর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া, দাদন ব্যবসায়ীদের মনিটর করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইলিশ মাছের খরচ বিশ্লেষণ করে এর সাইজ অনুযায়ী সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে ইলিশের প্রান্তিক বিক্রেতা ন্যায্য দাম পাবে, অন্যদিকে ভোক্তাদের কাছে তা নির্ধারিত দামে বিক্রি হবে।

কমিশনের প্রতিবেদনে দাম নির্ধারণের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি পাইকার বা আড়তদারদের কাছে মাছ বিক্রির জন্য জেলেদের সমবায় সমিতি গঠন করতে সুপারিশ করা হয়েছে। সরবরাহ চেইনের ধাপ কমানোর জন্য একটি অনলাইন প্ল্যাটর্ফম তৈরি, ন্যায্যা দামে ইলিশ বিক্রি নিশ্চিত করতে প্রধান প্রধান শহরগুলোতে সরকারি উদ্যোগে ইলিশের বিশেষ বিপণন কেন্দ্র স্থাপন, কোল্ড স্টোরেজ তৈরি করা, সকল আড়তদার ও পাইকারদের বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স প্রদান, সরবরাহ ব্যবস্থার ধাপ অনুযায়ী যৌক্তিক মুনাফা বেধে দেওয়া, দাদন প্রদানকারীদের দৌরাত্ম হ্রাসে সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত