ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহাসিক ইন্দ্রাপুরি মসজিদ

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০৪ এএম

ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে ১৭ শতকের শুরুর দিকে নির্মিত হয় ইন্দ্রাপুরি প্রাচীন মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে ‘মসজিদ তুহা ইন্দ্রাপুরি’ নামে পরিচিত, যা আচেহ অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো মসজিদগুলোর একটি। এখানে ইসলামের আগমণ, ইতিহাস, স্থাপত্যধারা এবং সভ্যতার রূপান্তরের অনন্য নিদর্শন এ মসজিদ। মসজিদটির অবস্থান আচেহ নদীর পূর্ব তীরে। নদী থেকে মাত্র একশ মিটার দূরত্বে ৩৩.৮৭৫ বর্গমিটার জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠা এই মসজিদ স্থাপত্যের দিক থেকেও অনন্য। যে জমিতে মসজিদটি নির্মিত, সেটি ছিল দ্বাদশ শতাব্দীর হিন্দু রাজ্য লামুরির এক মন্দিরের ভিত্তি। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল উত্তর সুমাত্রার প্রাচীন ও সমৃদ্ধ এক রাজ্য, যা ভারতীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রভাবের ধারক ছিল।

এক সময় চীনের নৌবাহিনীর সঙ্গে এ রাজ্যের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধের পর লামুরি রাজ্য বিজয় অর্জন করে তরুণ মুসলিম সেনানায়ক মিউরাহ জোহানের সহায়তায়। মিউরাহ জোহান ছিলেন ইসলামি লিঙ্গা বংশের রাজপুত্র। যুদ্ধজয়ের পর তিনি লামুরি রাজ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করেন এবং পরবর্তী সময়ে রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন। তার নেতৃত্বেই রাজ্যে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়। আর প্রাচীন মন্দিরের স্থানটি রূপান্তরিত হয় মসজিদে। ইতিহাসের এই অধ্যায়টি শুধু ধর্মান্তর বা স্থাপত্য রূপান্তর নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলামের শান্তিপূর্ণ বিস্তারের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।

মসজিদটি নির্মিত হয় ১৬০৭ থেকে ১৬৩৬ সালের মধ্যে। আচেহের সুলতান ইসমাইল শাহের সময়কালেই এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৬৯৬ ও ১৮৭৯ সালে দুটি বড় সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়, যার ফলে বর্তমান কাঠামোটি গড়ে ওঠে। তবে স্থাপত্যের মৌলিক ধারা অপরিবর্তিত থেকে যায়।

ইন্দ্রাপুরি মসজিদ স্থাপত্যের দিক থেকে আচেহ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ধারা অনুসরণ করেছে। পুরো মসজিদটি কাঠ ও পাথরের মিশ্রণে নির্মিত। ছাদের গঠন চতুর্ভুজাকার, ধাপে ধাপে ওপরের দিকে উঠেছে, যাতে আচেহ ও মিনাংকাবাউ স্থাপত্যশৈলীর মিলন ঘটে। মসজিদের ছাদ দেখতে অনেকটা ইন্দোনেশীয় ঐতিহ্যবাহী ‘রুমাহ আদাত’ বাড়ির মতো, যেখানে প্রতিটি ধাপে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতীকী অর্থ নিহিত আছে।

স্থাপত্যের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এর চারপাশে পাথরের প্রাচীর, যা মূলত প্রাচীন মন্দিরের আকারে রয়ে গেছে। প্রাচীরের ভেতরে প্রবেশের জন্য রয়েছে চারটি প্রবেশদ্বার। প্রতিটি দরজার ওপরে খোদাই করা রয়েছে সূক্ষ্ম নকশা, যা ইসলামি ক্যালিগ্রাফি ও আচেহের স্থানীয় শিল্পরীতির সমন্বয়ে তৈরি।

ওপরের অংশে কোনো গম্বুজ নেই। ছাদের কাঠামো এমনভাবে নির্মিত যে, আলো ও বাতাসের প্রবাহ প্রাকৃতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। দিনের বেলায় সূর্যের আলো কাঠের ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করে মসজিদের ভেতর এক স্নিগ্ধ আবহ তৈরি করে। এই স্থাপত্যরীতি পরিবেশবান্ধব ও প্রাকৃতিক নান্দনিকতার অনন্য উদাহরণ।

মসজিদটি আচেহ অঞ্চলের মুসলমানদের কাছে শুধু নামাজের স্থান নয়, বরং ঐতিহ্যের অংশ। স্থানীয়দের মধ্যে একটি প্রচলিত কথা আছে, ‘যে ইন্দ্রাপুরির মসজিদে নামাজ পড়ে, সে ইতিহাসের ছোঁয়া পায়।’ প্রতি শুক্রবার ও বিশেষ ধর্মীয় দিবসে এখানকার পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।

ইন্দ্রাপুরি মসজিদ নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। প্রতœতাত্ত্বিকরা মনে করেন, এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের এক প্রতীকী নিদর্শন। দ্বাদশ শতাব্দীতে যেখানে হিন্দু উপাসনার ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতো, সেখানেই কয়েক শতাব্দী পর উচ্চারিত হতে থাকে তাওহিদের ধ্বনি। এই রূপান্তর যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তন ও শান্তিপূর্ণ ধর্মপ্রচারের ফল।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় প্রন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত