সমাজে তালাক বৃদ্ধির কারণ

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:০৫ এএম

বর্তমান যুগে মানুষ নানা জটিল সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি হলো তালাক বা বিয়ে বিচ্ছেদ। ইসলাম ধর্মে তালাক বৈধ হলেও অপছন্দনীয় ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ এটি একটি পরিবারের ভিত্তি ভেঙে দেয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে তোলে এবং সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমাদের সমাজে তালাকের হার ক্রমেই বাড়ছে। এই বাড়ার পেছনে রয়েছে নানা জটিল কারণ। এই বিষয়ে তা বিশদ বিবরণী উল্লেখ করা হলো।

ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার অভাব : সমাজে তালাক বৃদ্ধির প্রধান কারণ ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব। ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার, ধৈর্য, সহনশীলতা ও পরস্পরকে সম্মান করার শিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেকেই ইসলামি পারিবারিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহমর্মিতা হারিয়ে যাচ্ছে। নামাজ, দোয়া ও আল্লাহভীতির অভাব মানুষকে উত্তেজিত করে তোলে, তাই ছোটখাটো বিষয়েও তারা বিচ্ছেদের পথ বেছে নেয়।

উচ্চাভিলাষ ও বস্তুবাদী জীবন : আজকের সমাজে মানুষ ক্রমে ভোগবাদে নিমজ্জিত হচ্ছে। অর্থ, বিলাসিতা, মর্যাদা ও সামাজিক স্ট্যাটাসের প্রতি আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে। স্বামী যদি স্ত্রীর প্রত্যাশা পূরণে অক্ষম হয়, তাহলে স্ত্রীর মনে ক্ষোভ জন্ম নেয়। অন্যদিকে স্ত্রী যদি স্বামীর আর্থিক অবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তাতেও সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব। এই অতৃপ্তি ধীরে ধীরে পারিবারিক জীবনে কলহ ডেকে আনে, যা শেষ পর্যন্ত তালাকের কারণ হয়।

পারিবারিক হস্তক্ষেপ ও ভুল পরামর্শ : অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর সামান্য বিরোধও বড় আকার ধারণ করে শুধু পরিবারের সদস্যদের অযথা হস্তক্ষেপের কারণে। বাবা-মা, শ্বশুরবাড়ি বা আত্মীয়স্বজন যখন পক্ষপাতিত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন, তখন সম্পর্কে ফাটল তৈরি হয়। ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি মীমাংসার বদলে তারা আগুনে ঘি ঢেলে দেন। ফলে দাম্পত্য সম্পর্কের ইতি ঘটে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার : ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের অযথা ব্যবহারও বর্তমানে তালাক বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অনলাইনে বন্ধুত্ব, সন্দেহ, পরকীয়া ও সময়ের অপচয়, সব মিলিয়ে দাম্পত্য জীবনে সৃষ্টি হয় অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্ব। অনেক সময় স্বামী বা স্ত্রী ভার্চুয়াল জগতে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ে যে, বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও ভালোবাসা উপেক্ষিত হয়, যা শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক ভাঙনের দিকে নিয়ে যায়।

ধৈর্য ও সহনশীলতার অভাব : আগের প্রজন্মে মানুষ ধৈর্যশীল ছিল। তারা পারিবারিক সংকটে সমাধানের পথ খুঁজত। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মে ধৈর্য হারিয়ে যাচ্ছে। সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতেই ‘তালাক দাও’, ‘আমি চলে যাচ্ছি’, এমন কথা উচ্চারিত হয়। দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার মানসিক প্রস্তুতি অনেকেরই নেই। ফলে সমস্যা দেখা দিলেই তারা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়।

ভুল জীবনসঙ্গী নির্বাচন : বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন। এটি টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন মানসিক, ধর্মীয় ও সামাজিক সামঞ্জস্য। অনেক সময় সৌন্দর্য, সম্পদ বা প্রভাব দেখে বিয়ে করা হয়। চরিত্র, বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই করা হয় না। ফলস্বরূপ বিয়ের পর দেখা যায় জীবনদর্শন ও চিন্তাধারায় বিরাট অমিল, যা সম্পর্ক ভাঙনের দিকে ঠেলে দেয়।

নারীর কর্মজীবন ও আধুনিকতার প্রভাব : নারীর কর্মজীবনে প্রবেশ সমাজে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এটি পারিবারিক দূরত্বও সৃষ্টি করেছে। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই ব্যস্ত থাকে নিজেদের কাজে। ফলে একে অপরকে সময় দিতে পারে না। মানসিক যোগাযোগের অভাব থেকে সম্পর্কে শিথিলতা আসে। অন্যদিকে, কিছু নারী আধুনিকতার নামে অতিরিক্ত স্বাধীনতা দাবি করে, যা অনেক সময় দ্বন্দ্বের কারণ হয়।

যৌতুক ও আর্থিক অসন্তুষ্টি : যৌতুকপ্রথা এখনো সমাজ থেকে পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। অনেক পুরুষ পরিবারের চাপ বা লোভে পড়ে স্ত্রীকে কষ্ট দেয়, যৌতুক দাবি করে। আবার অনেক নারীও স্বামীর আর্থিক দুরবস্থা নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকে। এসব আর্থিক টানাপড়েন অনেক সময় দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটায়।

সন্তান না হওয়া : অনেকের ক্ষেত্রে দাম্পত্য জীবনে সন্তান না হওয়া একটি বড় সমস্যা। কেউ কেউ এটি ধৈর্য ও চিকিৎসার মাধ্যমে সমাধান করতে চায় না, বরং দোষারোপ ও তর্ক-বিতর্ক শুরু করে। আবার অনেক ক্ষেত্রে সন্তান নেওয়া বা না নেওয়া নিয়ে মতবিরোধ হয়। এই বিষয়গুলোও অনেক সময় তালাকের দিকে নিয়ে যায়।

আইনগত ও সামাজিক সহানুভূতির অভাব : বর্তমানে তালাক প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হওয়ায় অনেকেই সহজেই এ পথে যায়। আগে সমাজে তালাকের প্রতি ছিল নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। পরিবার, আত্মীয় ও সমাজ একসঙ্গে সমাধান খুঁজত। এখন সেই সামাজিক সংহতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। কেউ কাউকে পরামর্শ দেয় না, বরং ‘তোমার ইচ্ছে’ বলে এড়িয়ে যায়।

সমাধানের পথ : তালাক সমাজের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি এটি প্রতিরোধযোগ্যও। এ জন্য প্রয়োজন কিছু কার্যকর উদ্যোগ। তা উল্লেখ করা হলো।

ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার প্রসার : ইসলামি শিক্ষা, পারিবারিক দায়িত্ব ও সহনশীলতার পাঠ সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে।

বিয়ে-পূর্ব পরামর্শ : বিয়ের আগে ছেলেমেয়ে উভয়কে জীবনসঙ্গী নির্বাচনে সচেতন ও পরিণত হতে হবে।

পারিবারিক আলোচনা : সমস্যা হলে তা গোপন না রেখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।

সমাজে সচেতনতা : তালাককে হালকাভাবে না দেখে, সেটার ভয়াবহতা সম্পর্কে প্রচার চালাতে হবে। সামাজিক মাধ্যমের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এর সীমা ও শালীনতা বজায় রাখতে হবে।

সচেতনতা বাড়াতে হবে : তালাক কখনোই সুখের নয়, এর দ্বারা একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। ইসলাম তালাকের সুযোগ রেখেছে কেবল তখনই, যখন সব সমঝোতার পথ ব্যর্থ হয়। কিন্তু বর্তমান সমাজে তা অনেকে ব্যবহার করছে খেলার মতো। এ প্রবণতা বন্ধ করতে হলে সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তি, এই তিন স্তরে সচেতনতা বাড়াতে হবে। দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে দরকার ধৈর্য, ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আল্লাহভীতি। মনে রাখতে হবে, তালাক শুধু দুজন মানুষকে নয়, বরং পুরো সমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত