গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর দুই সপ্তাহ কেটে গেলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি, বরং ক্ষুধা ও অপুষ্টি এখন ‘বিপর্যয়কর’ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির দাবি, ইসরায়েলের বাধার কারণে মানবিক সহায়তা সীমিত থাকায় গাজার মানুষ এখনো তীব্র খাদ্যসংকটে ভুগছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) আল জাজিরা প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবরুদ্ধ গাজায় যে পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী প্রবেশ করছে, তা জনগণের প্রয়োজন মেটানোর জন্য অপ্রতুল। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানায়, প্রতিদিন ২ হাজার টন ত্রাণ পাঠানোর লক্ষ্য থাকলেও এখন গড়ে মাত্র ৭৫০ টন খাদ্যই প্রবেশ করছে। কারণ, ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত সীমান্তে কেবল দুটি প্রবেশপথই খোলা রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেইয়েসুস বলেন, ‘পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ, কারণ যা ঢুকছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। যথেষ্ট খাদ্য না থাকায় ক্ষুধার পরিস্থিতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।’
এর আগে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার অন্তত এক-চতুর্থাংশ মানুষ বর্তমানে অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন, যাদের মধ্যে ১১ হাজার ৫০০ গর্ভবতী নারীও আছেন। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, এই ভয়াবহ খাদ্যসংকট পুরো এক প্রজন্মের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) উপ–নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রু স্যাবারটন জানান, বর্তমানে গাজায় জন্ম নেওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ শিশু সময়ের আগেই বা কম ওজন নিয়ে জন্ম নিচ্ছে, যেখানে ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগে এই হার ছিল মাত্র ২০ শতাংশ। তাঁর ভাষায়, ‘অপুষ্টির প্রভাব শুধু মায়ের নয়, নবজাতকের জীবনেও মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।’
খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইপিসি এ বছরের আগস্টে গাজা সিটিসহ আশপাশের এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করেছিল। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, তখন গাজা উপত্যকায় পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ ‘বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে’ ছিলেন।
মার্কিন মধ্যস্থতায় ১০ অক্টোবর শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম জোরদারের কথা থাকলেও বাস্তবে তার সুফল মিলছে না। পিএআরসি নামের ফিলিস্তিনি এনজিওর বিদেশি সম্পর্কবিষয়ক পরিচালক বাহা জাকউত বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ পরও গাজায় পরিস্থিতি ভয়াবহ।’
তিনি জানান, ‘বাণিজ্যিক ট্রাকে বিস্কুট, চকলেট, কোমল পানীয় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বীজ বা জলপাইয়ের মতো পুষ্টিকর খাদ্যসামগ্রী নিষিদ্ধ। এগুলো শিশু, নারী ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর ন্যূনতম পুষ্টিচাহিদাও পূরণ করতে পারে না।’
জাকউত আরও জানান, সামান্য ফল ও সবজি ঢুকলেও দাম আকাশছোঁয়া, এক কেজি টমেটো এখন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৫ শেকেলে, যা আগে ছিল মাত্র এক শেকেল।
এমন অবস্থায় বৃহস্পতিবার অক্সফাম, নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলসহ ৪১টি আন্তর্জাতিক সংস্থা এক যৌথ বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল নির্বিচারে গাজায় ত্রাণবাহী ট্রাকগুলো আটকে দিচ্ছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৮ হাজার ২৮০ জন নিহত এবং ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৭৫ জন আহত হয়েছেন।
গাজায় গণহত্যা ইসরায়েলের একার নয়- আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপও জড়িত