তুরস্কের বিখ্যাত কোজাতেপে মসজিদ

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:৪৩ এএম

তুরস্কের রাজধানী আনকারায় অবস্থিত বিখ্যাত কোজাতেপে মসজিদ। এটি আধুনিক তুরস্কের ধর্মীয় ঐতিহ্য, স্থাপত্যশৈলী ও জাতীয় আত্মপরিচয়ের অনন্য প্রতীক। আনকারার এই বিশাল মসজিদটি শহরের প্রায় সব জায়গা থেকেই দেখা যায়। দিনের আলোয় এর গম্বুজ ও মিনারগুলো যেন আকাশের সঙ্গে মিশে যায়। আর রাতে বৈদ্যুতিক আলোয় নান্দনিক দৃশ্যে পরিণত হয়।

কোজাতেপে মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয় বিশ শতকের চল্লিশের দশকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী তুরস্ক তখন এক নতুন রাষ্ট্রীয় রূপের সন্ধানে। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবল প্রভাবে ইসলামি চেতনা অনেকটাই আড়ালে চলে গিয়েছিল। ঠিক সেই সময় ১৯৪৪ সালের ৮ ডিসেম্বর তুরস্কের ধর্মবিষয়ক দপ্তরের সহসভাপতি আহমেদ হামদি আকসেকি এবং আরও বাহাত্তরজন বিশিষ্ট নাগরিক আনকারার ইয়েনিশেহির এলাকায় মসজিদ নির্মাণ সমিতি গঠন করেন। উদ্দেশ্য ছিল রাজধানীতে এমন একটি কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণ করা, যা ইসলামি ঐতিহ্যের মর্যাদা ধরে রাখবে এবং আধুনিক রাষ্ট্রের মানুষের হৃদয়ে ইমানের প্রতীক হয়ে থাকবে।

১৯৪৭ সালে প্রথমবার স্থপতিদের কাছ থেকে নকশা আহ্বান করা হয়। কিন্তু জমা পড়া কোনো নকশাই তৎকালীন দপ্তরের অনুমোদন পায়নি। এর প্রায় এক দশক পর ১৯৫৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দেরেস উদ্যোগ নেন মসজিদ নির্মাণের জমি বরাদ্দের। এক বছর পর আবারও প্রকল্প আহ্বান করা হয়। এ সময় ৩৬টি নকশা যাচাই শেষে নির্বাচিত হয় দুই স্থপতি ভেদাত দালোকাই ও নেজাত তেকেলিওগ্লুর আধুনিক ও সাহসী নকশা।

ভেদাত দালোকাইয়ের নকশাটি ছিল তুর্কি স্থাপত্যে এক বৈপ্লবিক প্রস্তাব। এটি ছিল প্রচলিত গম্বুজ ও মিনারের ধারণা থেকে অনেকটাই ভিন্ন। কিন্তু রক্ষণশীল মহলের তীব্র বিরোধিতায় নির্মাণকাজ থেমে যায় ভিত্তিপ্রস্তর পর্যায়েই। অনেকেই একে ইসলামি ঐতিহ্যের পরিপন্থি বলে আখ্যা দেন। ফলে প্রকল্পটি স্থগিত থাকে বছরের পর বছর।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর ১৯৬৭ সালে তৃতীয়বারের মতো আহ্বান করা হয় নতুন নকশা। এবার নির্বাচিত হয় স্থপতি হুসরেভ তাইলা ও এম. ফাতিন উলুএঙ্গিনের পরিকল্পনা, যা ছিল ঐতিহ্যনির্ভর, ওসমানীয় ধাঁচের। এটি গ্রহণযোগ্য হয় সমাজের সব মহলে। অবশেষে ১৯৮৭ সালে ২০ বছরের দীর্ঘ সময় শেষে সম্পন্ন হয় কোজাতেপে মসজিদ।

কোজাতেপে মসজিদের স্থাপত্য তুরস্কের ইসলামি ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি। এটি ওসমানীয় রাজকীয় মসজিদগুলোর ধারায় নির্মিত। এর চারটি সুউচ্চ মিনার, বিশাল গম্বুজ এবং শে^ত-ধূসর রঙের সমন্বয়ে গঠিত এক অপরূপ সৌন্দর্য। প্রধান গম্বুজটির ব্যাস প্রায় ২৫ মিটার, যা চারটি খিলানের ওপর স্থাপিত। চারদিকে রয়েছে ছোট ছোট গম্বুজ, যেন স্তরক্রমে ওপরের দিকে উঠেছে এক আধ্যাত্মিক স্থাপত্য।

এই নকশা মূলত এডিরনের সেলিমিয়ে মসজিদ এবং ইস্তাম্বুলের সুলতান আহমেদ মসজিদের অনুপ্রেরণায় তৈরি। সেই সঙ্গে পূর্ব রোমান স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হাজিয়া সোফিয়ার প্রভাবও স্পষ্ট। বাহির থেকে দেখা যায় চারটি সুউচ্চ মিনার, প্রতিটির উচ্চতা ৮৮ মিটার। আকাশ ছোঁয়া এই মিনারগুলো যেন আনকারার আধুনিক দিগন্তের মাঝে ইমানের পতাকা তুলে ধরে।

মসজিদের ভেতর প্রবেশ করলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। সাদা মার্বেল, নীল টাইলস এবং সোনালি অলংকরণে সজ্জিত পুরো দালান। বিশাল প্রার্থনাকক্ষে একসঙ্গে প্রায় ২৪ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারে। গম্বুজের অভ্যন্তরে নকশাগুলোতে কোরআনের আয়াত লেখা, ঝুলন্ত ঝাড়বাতিগুলো এক ধরনের আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি করে।

প্রধান মিহরাবটি সূক্ষ্ম কারুকাজে মোড়ানো, মিম্বারটি তৈরি খাঁটি মার্বেল দিয়ে। ভেতরের দেয়াল জুড়ে আরবি ক্যালিগ্রাফি ও ফুলেল নকশা ইসলামি শিল্পকলার উজ্জ্বল পরিচায়ক। বাইরের প্রাঙ্গণটি প্রশস্ত, সেখানেও মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতে পারেন।

কোজাতেপে মসজিদ কেবল নামাজের স্থান নয়, বরং এটি আনকারার ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে নিয়মিত আয়োজন করা হয় ধর্মীয় আলোচনা, কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইসলামি শিল্প প্রদর্শনী। রমজানে এই মসজিদ হয়ে ওঠে তুর্কি মুসলমানদের মিলনমেলা। ইফতার ও তারাবির সময় চারদিক ভরে যায় মানুষের ভিড়ে।

এ ছাড়া মসজিদ কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে রয়েছে ইসলামি গ্রন্থাগার, সম্মেলন কক্ষ, নারী-পুরুষের আলাদা অজুখানা, এমনকি ধর্মীয় শিক্ষার জন্য আলাদা কক্ষ। ফলে এটি হয়ে উঠেছে এক বহুমাত্রিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত