সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের ২টি ইউনিয়নের ৯টি গ্রামে যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। গ্রামগুলি হলো সোনাতনী ইউনিয়নের মাকড়া, ধীতপুর, শ্রীপুর, কুড়সি, বারপাখিয়া, লোহিন্দাকান্দি, গালা ইউনিয়নের বৃ-হাতকোড়া ও মোহনপুর গ্রাম। বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে এ পর্যন্ত এই ভয়াবহ ভাঙনের তাণ্ডবে এ সব গ্রামের অধিকাংশ ফসলি জমি, ৫ শতাধিক বাড়িঘর, ২টি মসজিদ, ২টি মাদরাসা ও ১টি কবরস্থান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখনও ভাঙন অব্যাহত থাকায় অবশিষ্টটুকুও বিলিনের পথে। এ ছাড়া ধীতপুর-কুরসি গ্রামের ২টি হাট-বাজারের অর্ধেক অংশ নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। এখানে দ্রুত জিওটেক্স বালুর বস্তা ফেলা না হলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তা যমুনা গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
১ মাস আগেও এসব গ্রামে বাড়িঘর ছিল, এখন সেখানে অথৈ পানি আর পানি। এখানকার জমিতে প্রচুর পরিমাণে পটল, বেগুন, ধান, বাদাম, মাষকালাই, বাঙ্গী, সব্জি, ধনিয়াসহ সব ধরনের ফসল আবাদ হয়ে থাকে। এ ছাড়া এখানকার কৃষকেরা ষাড় গরু, ছাগল, ভেড়া,হাঁস, মুরগি ও কবুতর লালন পালন করে বাড়তি আয় করে। ফলে যমুনা নদীবেষ্টিত সোনাতনী ইউনিয়নের মানুষ আগের চেয়ে অনেক স্বচ্ছল হয়ে উঠেছে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এখানে নতুন করে যমুনার ভাঙন শুরু হয়েছে। ফলে এ এলাকার অধিকাংশ ফসলি জমি ও বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ফলে এখানকার কৃষকেরা নতুন করে ভাঙনের কবলে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
এ বিষয়ে ধীতপুর গ্রামের সাত্তার প্রামানিক, আসমা খাতুন, চম্পা বেগম বলেন, এই চরে প্রচুর পরিমাণে পটল, বেগুন, ধান, বাদাম, মাষকালাই, বাঙ্গী, সব্জি, ধনিয়া সহসব ধরনের ফসল চাষ হয়ে থাকে। ৮৮ সাল থেকে এখানে ভাঙা শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত ১০/১১ ভাঙা দিছি। পটলসহ নানা ফসল আবাদ করে সংসার ভালোই চলছিলাম। এখন বাড়িঘর ও ফসলি জমি সবকিছু নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় আমরা এখন অন্যের জমিতে ঘর তুলে থাকি। এ ঘরটিও ভাঙনের কবলে পড়েছে। এ ভিটা ভেঙে গেলে কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেব, কি খাব তা নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় পড়েছি।
এ বিষয়ে গ্রামের কমেলা খাতুন, বাতেন বেপারি, রাজ্জাক সরদার আব্দুস সামাদ ও মনোয়ারা বেগম জানান, এ পর্যন্ত ১২/১৪ বার বাড়িঘর ও ফসলি জমি যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আবারও ভাঙনের কবলে পড়েছেন তারা। এখন তাদের রাত কাটে ভাঙন আতঙ্কে।
রজিনা খাতুন বালি বলেন, সোনাতনীর বালুমাটি সোনার মতোই ছিল। এই বালু মাটিতে যা বুনেছি তাই ভালো জন্মেছে। শাকসব্জি বুনে আমাদের সংসার ভালোই চলছিল। এখন ভাঙনের কবলে পড়ে সবকিছু নদীতে চলে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে সোনাতনী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শামছুল হক বলেন, গত এক বছরে সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর থেকে বারোপাখিয়া পর্যন্ত ৫/৬টি গ্রামের প্রায় ৪/৫০০ বাড়িঘর, ২টি মসজিদ, ২টি মাদরাসা ও ১টি কবরস্থান যমুনা নদীতে চলে গেছে। এই ভাঙনরোধে এখানে দ্রুত বাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন।
শাহজাদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গত ৫/৬ বছরে এ ২টি ইউনিয়নের গ্রামগুলিতে কমপক্ষে ২৭০ হেক্টোর ফসলি জমি যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গব কয়েক মাসের ভাঙনে ৭০ থেকে ১০০ হেক্টোর আবাদি জমি নদীতে চলে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর বিপরিত পাশে ৮০/৯০ হেক্টোর বালুর চর জেগে উঠেছে। কিন্তু তা এখনও আবাদ যোগ্য হয়ে ওঠেনি। আবাদ যোগ্য হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে। ফলে এ সব জমি এলাকাবাসির এখন কোনও কাজেই আসছে না।
শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. কামরুজ্জামান বলেন, ইতোমধ্যেই করিসী-ধীতপুরের ভাঙন এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে এ ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নিতে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলেছি। তারা ভাঙন এলাকায় দ্রুত বস্তা ফেলার ব্যবস্থা করবেন বলে জানিয়েছেন।
