ভারতে দিওয়ালিতে বাজি ফেটে অন্ধ বহু শিশু-কিশোর

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৫, ১১:৫০ এএম

ভোপাল শহরের একটি হাসপাতালের বিছানায় বসে ছিল ১৫ বছর বয়সী আরিশ। তার চোখের কালো চশমার পেছনে লুকিয়ে ছিল বাঁ চোখের ক্ষত। সপ্তাহখানেক আগে দিওয়ালির আলোর উৎসবে সে একটি নতুন ধরনের বাজি কিনেছিল। সেটি তার মুখের কাছে ফেটে যায়। বিস্ফোরণে আরিশ তার বাঁ চোখের দৃষ্টি হারিয়েছে।

চোখে জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তবে চিকিৎসকরা নিশ্চিত নন যে আরিশ কতটা দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে। সে স্কুলে যায় না। পরিবারে আয় করতে টেলিভিশন সারাইয়ের কাজ করে। কাজে ফিরতে পারবে কিনা, সেটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তিত। ভারতে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও আরিশের মতো লক্ষাধিক অপ্রাপ্তবয়স্ক কাজ করে।

আরিশের মতো উত্তর ভারতের অন্তত পাঁচটি রাজ্যের কয়েকশ শিশু-কিশোর দিওয়ালিতে একই ধরনের বাজি ফাটানোর সময় চোখে আঘাত পেয়েছে। ‘কার্বাইড গান’ নামের এই নতুন বাজির কথা এর আগে কেউ শোনেনি। দিওয়ালির কয়েকদিন আগে থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘরে তৈরি এই বাজির ভিডিও ভাইরাল হতে থাকে।

হামিদিয়া হাসপাতালে অপারেশনের পরে ১৪ বছর বয়সী করণ

এটি তৈরি করা হয় একটি সাধারণ প্লাস্টিকের পাইপে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ভরে। এরপর সেটি থেকে বন্দুকের মতো আওয়াজ ও আলোর ঝলকানি বের হয়। কিন্তু কখন বিস্ফোরণ ঘটবে, তা অনিশ্চিত। অনেক সময় দেরিতে ফাটে এই বাজি। বাজি না ফাটায় কারণ খুঁজতে গিয়ে শিশুরা যখন পাইপের ভেতরে উঁকি দেয়, ঠিক তখনই বিস্ফোরণ ঘটে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

ক্যালসিয়াম কার্বাইডের কেনাবেচা ভারতে নিয়ন্ত্রিত। তবে কৃষক ও দোকানদারেরা ফল পাকানোর জন্য এই রাসায়নিক ব্যবহার করেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চাষের জমিতে জন্তু-জানোয়ার তাড়ানোর জন্যও এই ঘরোয়া বন্দুক ব্যবহৃত হয়। তবে গত সপ্তাহে এত বেশি সংখ্যক আহতের খবর আসার আগে পর্যন্ত ভারতের বেশির ভাগ মানুষই এই বন্দুকের নাম শোনেননি।

সামাজিক মাধ্যমে এই যন্ত্র বানানোর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তর ভারতজুড়ে এটি ‘কার্বাইড গান’ নামে বাজি হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

মধ্য প্রদেশের ভোপাল জেলাতেই কার্বাইড গান ফেটে একশর বেশি মানুষ আহত হন। তাদের মধ্যে অন্তত ১৫ জনের চোখে অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। রাজ্যের তিনটি অন্য জেলা থেকেও একশর বেশি ঘটনার খবর মিলেছে।

বিহারের রাজধানী পাটনার রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অফ অপথালমোলজির প্রধান ড. বিভূতি প্রসন্ন সিনহা জানান, ওই রাজ্যে একই ধরনের বিস্ফোরণে ১৭০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪০ জনের চোখে অপারেশন করতে হয়েছে। তার মতে, প্রকৃত আহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, উত্তর প্রদেশ ও দিল্লিতেও একই ধরনের বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। মধ্য প্রদেশের মতো কয়েকটি রাজ্য এখন কার্বাইড গান ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কয়েকজন বিক্রেতাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

ভোপালের হামিদিয়া হাসপাতালের চক্ষুরোগ বিভাগের প্রধান ড. কভিথা কুমার বলেন, আমাদের কাছে আসা রোগীদের মধ্যে হালকা, মাঝারি ও ব্যাপক-তিন ধরনের আঘাতই দেখা গেছে। যারা কম আঘাত পেয়েছেন, তাদের চোখের পাতায় রাসায়নিক বিক্রিয়ায় হালকা পুড়েছে। মাঝারি আঘাতপ্রাপ্তদের কর্ণিয়ায় রাসায়নিক কণা ঢুকে ক্ষত সৃষ্টি করেছে। যাদের বেশি আঘাত, তাদের কর্ণিয়া ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সাময়িক দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়েছে। অপারেশনে দৃষ্টিশক্তি ফিরলেও সময় লাগবে।

কয়েকজন চিকিৎসক আঘাতের ভয়াবহতা দেখে চমকে গেছেন বলে বিবিসিকে জানান। হামিদিয়া হাসপাতালের আরেক চিকিৎসক ড. অদিতি দুবে বলেন, দিওয়ালির বাজি ফেটে রাসায়নিক আঘাতের এমন ঘটনা তিনি এর আগে কখনও দেখেননি। কার্বাইড গান সম্পর্কে তথ্য খুঁজে নিয়ে তবেই তিনি চিকিৎসা করছেন।

বহু রোগী জানিয়েছেন, ইনস্টাগ্রাম রিলস ও ইউটিউবে ভিডিও দেখেই তারা কার্বাইড গান কিনেছেন। এই বাজির আকর্ষণ ছিল এর কম দাম-মাত্র দেড় থেকে দুইশো টাকা। বেশি শব্দ ও আলোর ঝলকানির জন্য তুলনামূলক সস্তা এই বাজি।

ইন্টারনেটে ‘কার্বাইড গান’ লিখে সার্চ করলেই ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবে কয়েক ডজন ভিডিও মিলবে। সেখানে অল্পবয়সীরা এই বাজি বানিয়ে ফাটিয়ে দেখাচ্ছেন। কিছু ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে যুক্ত করা হয়েছে র‍্যাপ সংগীত। কেউ কেউ এগুলোর নাম দিয়েছেন ‘বিজ্ঞানের পরীক্ষা’। কখনও হ্যাশট্যাগ দেওয়া হয়েছে ‘উপযোগী প্রজেক্ট’ বা ‘পরীক্ষামূলক ভিডিও’।

পাটনার হাসপাতালের ড. সিনহার ভাষ্য, তার এক ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র রোগী সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও দেখে নিজেই কার্বাইড গান বানিয়েছিল। বিস্ফোরণে তার একটি চোখের দৃষ্টি চলে গেছে।

ক্যালসিয়াম কার্বাইডের ক্ষতিকর প্রভাব ও অপব্যবহার রোধে ভারতে এর উৎপাদন ও মজুত রাখার ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এই রাসায়নিক জলের সংস্পর্শে এলে দাহ্য ও ক্ষতিকর অ্যাসিটাইলিন গ্যাস তৈরি হয়। ১৯৮৭ সালের ক্যালসিয়াম কার্বাইড বিধি অনুযায়ী, দুইশ কিলোগ্রামের বেশি এই রাসায়নিক মজুত রাখতে লাইসেন্স লাগে। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোপালের এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, ফল পাকানোর কাজে এই রাসায়নিক ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়।

ভোপালের পুলিশ কমিশনার হরিনারায়নাচারি মিশ্র বলেন, উত্তর ভারতে বিয়ের অনুষ্ঠান বা খেত থেকে বাঁদর তাড়াতেও কার্বাইড গান ব্যবহার হয়।

অল ইন্ডিয়া অপথালমোলজিকাল সোসাইটির সভাপতি ড. পার্থ বিশ্বাস দাবি করেন, কার্বাইড গান দ্রুত নিষিদ্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, এটি এখন জাতীয় স্তরের সমস্যা। দিওয়ালির দুর্ঘটনা বলে এই ঘটনাগুলোর গুরুত্ব কমিয়ে দেখলে চলবে না। ভারত ক্রিকেট ম্যাচ জিতলে বা নববর্ষের মতো উৎসবেও এগুলো ব্যবহার হতে পারে।

তার মতে, এই কার্বাইড বোমা বা গান স্থায়ীভাবে অন্ধত্ব এনে দিতে পারে। শরীরের অন্য অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কেউ পঙ্গুও হয়ে যেতে পারেন। তিনি এই যন্ত্র বানানো ও ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অভিযান ও ক্যালসিয়াম কার্বাইডের উৎপাদন-বিক্রয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান।

ভোপালের হাসপাতালে মাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে আলজাইন

হামিদিয়া হাসপাতালে সাত বছর বয়সী আলজাইনকে তার মা আঁকড়ে ধরে রয়েছেন। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর তার চোখে অপারেশন হয়েছে। ইউটিউবের ভিডিও দেখে তার কাকার কাছ থেকে এই কার্বাইড গান কিনে এনেছিল সে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে আলজাইনের মা আফরিন ছেলের পাশ থেকে নড়ছেন না।

 

তিনি বললেন, ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব ভয় পাচ্ছি। শুধু কামনা, ও যেন আবার দেখতে পায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত