বাংলাদেশের ফটোসাংবাদিকতার সূচনাপর্বের একজন অগ্রগণ্য আলোকচিত্রী মাহবুব আলী মতি। দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ছবি তোলার মধ্য দিয়ে তার ফটোসাংবাদিকতা জীবনের শুরু। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদেরও একজন। তার সম্পর্কে জানতে ২০২৩ সালের ১২ মে সকালে প্রেসক্লাবে গিয়ে হাজির হই।
ফটোসাংবাদিক বুলবুল আহমেদ বললেন, ‘মতি ভাইয়ের পরিবারের কারো সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তুমি বরং পল্টনে গিয়ে দেখতে পারো। ওখানেই এখন ‘স্টুডিও প্যানোরমা’, যেটা মতি ভাইয়ের এক ছেলে চালায়।’
সুনির্দিষ্ট ঠিকানা না জানা থাকলে ঢাকা শহরে জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন। বেশ খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে ১২ নম্বর পুরানা পল্টনের এল. মল্লিক কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলায় গিয়ে পাই স্টুডিও প্যানোরমা। খুবই ছোট আর সাদামাটা একটা স্টুডিও। দূর থেকে যত নামডাক শুনেছি কাছে গিয়ে তার লেশমাত্র দেখতে পেলাম না। স্টুডিওতে মাত্র দুজন কর্মচারী! ছবি তোলার চাপ নেই, তাই অলস সময় কাটাচ্ছেন তারা।
গিয়াসউদ্দিন নামের কর্মচারীটি জানালেন, স্টুডিওটি এখন পরিচালনা করেন মাহবুব আলী সাহেবের অষ্টম সন্তান আলী হায়দার। তিনি প্রতিদিন আসেন না, মাঝে সাজে আসেন।’
আলী হায়দারের ফোন নম্বর নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলি। পরদিন তিনি আমাকে প্যানোরমায় যেতে বলেন। শুরুতেই আলী হায়দারের কাছে জানতে চাই, মাহবুব আলীর নেগেটিভগুলোর কী অবস্থা?
তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ‘বাবার তোলা ছবিগুলো যে এত গুরুত্বপূর্ণ, আমরা আগে তা বুঝতেই পারি নাই। কাজে লাগবে না ভেবে অনেক নেগেটিভ ফেলেও দিয়েছি। নষ্টও হয়েছে অনেক। তবে বেশ কয়েকটি দুর্লভ নেগেটিভ এখনো আমাদের সংগ্রহে রয়ে গেছে। বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের যে পোর্ট্রেটগুলো সব জায়গায় দেখা যায় সেগুলো আমাদের স্টুডিওতেই তোলা। ১৯৬৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তিনি এবং এক ভদ্রলোক পাসপোর্ট সাইজ ছবি তুলতে প্যানোরমায় আসেন। প্যানোরমা ছিল তখন ১৭ নম্বর ঢাকা স্টেডিয়াম মার্কেটের নিচতলায়। সেদিন তিনি বিমান বাহিনীর পোষাকে ছিলেন। আর তার সঙ্গের লোকটির গায়ে ছিল কালো স্যুট। ওই দিন রোলিফ্লেক্স ক্যামেরা ও আগফা গেভার্ট ফিল্মে মতিউর রহমানের চারটি, স্যুটপরা ভদ্র লোকের তিনটি ও দুইজনের একত্রে দুটি ছবি তোলা হয়।’
আলী হায়দার বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের পাঁচটি ছবির প্রিন্ট দেখান। এর মধ্যে চারটি তার একক পোর্ট্রেট। আরেকটি দুজনের একত্রে। মতিউর রহমানের পাসপোর্ট ছবিগুলো প্রায় সবার দেখা। কিন্তু গ্রুপ ছবিটিতে মতিউর রহমানের পাশের ভদ্রলোকটি কে, কী তার পরিচয়, দুজনের মধ্যে সম্পর্ক কী- জানতে চাইলাম আলী হায়দারের কাছে। তিনি এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারলেন না।
ওই দিনই আমি মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমানকে ফোন করি। ফোনটি ধরেন শাহাদৎ হোসেন নামের একজন। তিনি জানালেন, ‘মিলি রহমান নামে তিনি কাউকে চেনেন না। তবে এই নম্বরে ফোন করে অনেকে মিলি রহমানকে চান।’ বুঝলাম, মিলি রহমানের ফোন নম্বরটি পরিবর্তন হয়ে গেছে।
পরদিন আমি মিলি রহমানের খোঁজে তার মনিপুরীপাড়ার বাসায় যাই। গিয়ে শুনি, তিনি বাড়ি বিক্রি করে কয়েক বছর আগে আটলান্টায় চলে গেছেন। বাড়ির নতুন বাসিন্দারা তার ঠিকানা কিংবা ফোন নম্বর দিতে পারলেন না। আশপাশের আরো দুয়েক বাসায় খোঁজ করলাম। তারাও কিছু জানেন না। ভাবলাম, এই ছবির গল্প আর কোনো দিন জানা হবে না।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর আলোকচিত্রী জয় কে রায় চৌধুরীর সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছিল। অনেকক্ষণ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘এখন ফোন রাখতে হবে। বন্ধুর বাসায় দাওয়াত আছে।’
কথায় কথায় বললেন, ‘আমার বন্ধুকে তুমি চিনতে পারো। সঙ্গীতশিল্পী, বিখ্যাত মানুষ। নাম-সাইরাজ আলতাফ সাসা, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ভ্রাতুষ্পুত্র।’ শুনে আমার প্রত্যাশার অন্ধকারে এক টুকরো আলোর রেখা উঁকি দিল। জয় চৌধুরীকে বললাম, ‘দুই বছর ধরে আমি মতিউর রহমানের পরিবারের কাউকে খুঁজছি। আমার কাছে একটি ছবি আছে। ছবিতে থাকা এক ব্যক্তির পরিচয় কেবল তার পরিবারের লোকরাই দিতে পারবে।’
আমি জয় চৌধুরীকে হোয়াটসঅ্যাপে ছবিটি পাঠাই সাসাকে দেখানোর জন্য। কিছুক্ষণ পর জয় চৌধুরীর ফোন-‘তুমি এক্ষুনি সাসাকে ফোন করো। ছবি দেখে ও অস্থির হয়ে গেছে।’
সাসাকে ফোন করতেই রহস্যভেদ হয়। সাসা বললেন, ‘এই ছবিটা আমরা বহু বছর ধরে খুঁজছি, পাই নাই। এমন দুষ্প্রাপ্য ছবিটি আপনি কেমন করে পেলেন?’ আমি কিছু বলার আগেই সাসা বলতে শুরু করলেন, ‘মতিউর রহমানের পাশের লোকটি আমার বাবা এম ডি আলতাফুর রহমান। তিনি মতিউর রহমানের বড় ভাই। মতিউর রহমানরা ৯ ভাই, ২ বোন। মতিউর ষষ্ঠ আর আলতাফুর চতুর্থ। আলতাফুর রহমান ব্যাংকার ছিলেন। পাকিস্তান আমলে ছিলেন হাবিব ব্যাংকের কর্মকর্তা। পরে তিনি সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছিলেন। আমার দাদা মৌলভী আবদুস সামাদ যখন মারা যান তখন মতিউর রহমান খুব ছোট। ফলে আমার বাবাই মতিউর চাচাকে লেখাপড়া শেখান। মতিউর চাচা যখন পাকিস্তান বিমান বাহিনী পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন তখন বাবাই তাকে সারগোদায় রেখে আসেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে ছিল খুব মিল। ১৯৬৭ সালে মতিউর রহমান ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদোন্নতি পেয়ে ঢাকায় আসেন। তখন কোনো একটি স্টুডিওতে গিয়ে তুলেছিলেন তারা।’
পুনশ্চ: ১৯৫৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার স্টেডিয়াম মার্কেটে ‘প্যানোরমা ফটোগ্রাফারর্স’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সময় প্যানোরমা ঢাকার খুব গুরুত্বপূর্ণ স্টুডিও হিসেবে পরিচিতি পায়। স্টুডিওটির প্রতিষ্ঠাতা মাহবুব আলী মতিকে তখন সবাই ‘প্যানোরমা মতি’ বলে সম্বোধন করতো। ২০০৪ সালের ৪ অক্টোবর স্টুডিও প্যানোরমা স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে পল্টনে আসে। ২০২৫ সালের ১ আগস্ট স্টুডিও প্যানোরমা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
