নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে স্বাভাবিক পরিবেশ থাকলেও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হওয়া চারটি কারখানা পুনরায় চালুর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এখানো। বন্ধ হওয়া চার কারখানা যথাক্রমে- সেকশন সেভেন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, ইপিএফ প্রিন্টিং লিমিটেড, দেশবন্ধু টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড ও মিইগো বাংলাদেশ লিমিটেড এর শ্রমিক রয়েছেন প্রায় সাড়ে ছয় হাজারের মতো।
এদিকে শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে কারখানা কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে গত বুধবার (২৯ অক্টোবর) একটি কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন। এতে প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবদুস সামাদ শিকদারকে।
জানা যায়, গত রবিবার (২৬ অক্টোবর) বিকালে নোটিশের মাধ্যমে অনির্দিষ্টকালের জন্য ইপিজেডের এই চার কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরের দিন গত সোমবার (২৭ অক্টোবর) সকালে কারখানা পুনরায় চালুর দাবিতে ইপিজেডের সামনে বিক্ষোভ করে শ্রমিকরা। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললে তারা বিক্ষোভ তুলে নেয়।
শ্রমিকরা জানান, কিছুদিন থেকে বেতন ভাতা বৃদ্ধি, বোনাসসহ নানা দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিল তারা। এক পর্যায়ে গত রবিবার বিকালে কর্তৃপক্ষ এই চার ফ্যাক্টরি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।
শ্রমিকরা বলেন, চারদিন ধরে চারটি কারখানা বন্ধ রয়েছে। কারখানা বন্ধ থাকায় আমাদের শ্রমিক ও শ্রমিক পরিবারের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আমরা পরিবার চালাই এই কাজের আয়ে। প্রশাসনের পক্ষে আলোচনা চলছে, তবে কবে কারখানা আবার চালু হবে তা নিয়ে কেউ নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
দেশবন্ধু টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড শ্রমিক সালাম আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনদিন ধরে বাড়িতে বসে আসি। দুই সন্তান স্কুলের বেতন, সংসারের সব কিছু এই কাজের আয় থেকে চলে। ফ্যাক্টরি কবে চালু হবে, আর বেতন না পেলে কিভাবে সন্তানের স্কুলের বেতন পরিশোধ করবো, সংসার কীভাবে চালাব।
বন্ধ থাকা সেকশন সেভেন এর পরিচালক আতিকুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, এই ফ্যাক্টরিতে সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক কাজ করেন। কয়েকদিন থেকে বন্ধ থাকায় এখন তারা আবার চালু করার জন্য একত্র হচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা ফ্যাক্টরি চালু করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিব।
ইপিজেডকে অস্থিতিশীল করার পেছনে ইন্ধন যোগাচ্ছে আওয়ামী লীগ অভিযোগ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নীলফামারী জেলা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল মজিদ বলেন, দেশের সকল ইপিজেডে একটার পর একটা ফ্যাক্টরিতে শ্রমিক আন্দোলন তারই প্রমাণ দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্র করতে আওয়ামী লীগ। এনসিপি তা হতে দিবে না। এনসিপি মালিক ও শ্রমিক পক্ষকে বুঝিয়ে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছি বরাবরই। আশা করি কিছু দিনের মধ্যে সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।
জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার বলেন, এই ইপিজেড আমাদের জাতীয় সম্পদ। নীলফামারী জেলার সম্পদ। এটাকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার। অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। এখানে যারা কাজ করেন তাদের এবং যারা বিনিয়োগ করেছেন তাদের স্বার্থও যাতে ক্ষুন্ন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
তিনি বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে যারাই দায়ী, তাদের চিহিৃত করে আইনের আওতায় আনা দরকার। তাহলে চক্রান্তকারীরা সাহস পাবে না।
নীলফামারী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও ইঞ্জিনিয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের আহ্বায়ক প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন বলেন, উত্তরা ইপিজেডে শুধু নীলফামারী নয় আশপাশের এলাকার হাজার হাজার মানুষ কাজ করছে। ইপিজেড বন্ধ হলে উত্তরবঙ্গসহ দেশের অর্থনীতির ওপর বড় একটি ধাক্কা আসবে। আমরা চাই না ইপিজেড বন্ধ হোক। এটি বন্ধ হয়ে গেলে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বে। দেশে বেকারত্ব বাড়বে। তাই এই ইপিজেড আমাদের রক্ষা করতে হবে।
তিনি বলেন, একটি দল ষড়যন্ত্র করছেন ইপিজেড নিয়ে, তাদের ষড়যন্ত্র সফল হতে দেওয়া যাবে না। এজন্য সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।
নীলফামারী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম আর সাঈদ জানান, ইপিজেডের পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সেখানে, যাতে কোন অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি না হয়। সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে ইপিজেডকে।
নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, সমস্যা সমাধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুস সামাদ শিকদারকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়েছে। এতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীসহ রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ রয়েছেন। এই কমিটি বন্ধ হওয়া চার ফ্যাক্টরী ও শ্রমিকদের সাথে আলাদা আলাদা ভাবে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবে।
প্রসঙ্গত, ২০০১ সালে নীলফামারীর সদরের সংগলশী এলাকায় ২১৩ দশমিক ৬৬ একর এলাকার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা উত্তরাঞ্চল (উত্তরা ইপিজেড)। বর্তমানে এখানে ২৭টি দেশি-বিদেশি কারখানা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। যেখানে নারী-পুরুষ মিলে প্রায় ৩৫ হাজারের ওপর কমর্চারী-শ্রমিক কাজ করে। এ বাদে আরো ৬টি কারখানা উৎপাদনে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে।
