প্রাথমিকের শিক্ষকরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:২৬ এএম

দশম গ্রেডে বেতনসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা গতকাল শনিবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হন। পরে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে শাহবাগ মোড়ে গিয়ে ‘কলম সমর্পণ’ কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করেন। সেখান থেকে তারা প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। এতে শতাধিক শিক্ষক আহত হন। 

এদিকে পুলিশের এই হামলার প্রতিবাদে আন্দোলনরত শিক্ষকরা সারা দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রবিবার (আজ) থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পূর্ণদিবস কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে রাজধানীতে শহীদ মিনারে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছেন তারা।

প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। অবশ্য খুলনায় প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের এক অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেড থেকে সরাসরি দশম গ্রেডে উন্নীত করার কোনো সুযোগ নেই। সে কারণে এ মুহূর্তে তাদের আন্দোলন যৌক্তিক নয়। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তারা কথা বলতে পারেন, কিন্তু আন্দোলনের নামে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা বিঘিœত হলে সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি শেষে শিক্ষকরা ‘কলম বিসর্জন’ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। এরপর তিন দফা দাবিতে শাহবাগের দিকে যাত্রা শুরু করলে পুলিশ বাধা দেয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শিক্ষকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। অনেক শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আশ্রয় নেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামানের আঘাতে বহু শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েন।  খুলনা থেকে আগত আন্দোলনরত শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ আমাদের গায়ে হাত তুলেছে। লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান নিক্ষেপ করেছে। এই সরকারের পুলিশের কাছে এমন আচরণ আশা করিনি। আমরা ন্যায্য দাবি আদায়ে আন্দোলন করছি। আমাদের দাবি অযৌক্তিক নয়। আমাদের ওপর হামলা হয়েছে, রক্তক্ষরণ হয়েছে দাবি মানা না হলে স্কুলে ফিরব না।’ 

ঢামেক প্রতিনিধি জানান, পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডে শিক্ষক, পুলিশ সদস্য, রিকশাচালকসহ অন্তত ১১০ জন আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। গতকাল বিকেল থেকে আহতরা একে একে হাসপাতালে আসতে থাকেন। ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর মো. বাচ্চু মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘বিকেলের পর থেকে আহতদের আনা হচ্ছে। সবাইকে জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশই চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন, বাকিরা চিকিৎসাধীন।’ 

‘প্রাথমিক শিক্ষক দশম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাছুদ বলেন, ‘দাবি বাস্তবায়ন ও পুলিশি হামলার প্রতিবাদে রবিবার থেকে শহীদ মিনারে অবস্থানের পাশাপাশি সারা দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালিত হবে।’ 

শহীদ মিনারে কর্মবিরতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (কাশেম-শাহিন) সভাপতি মো. আবুল কাশেম দেশের সব প্রাথমিক শিক্ষককে ঢাকায় অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘দাবি আদায় ও গ্রেপ্তারদের মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত রবিবার থেকে সারা দেশে লাগাতার কর্মবিরতি চলবে। প্রত্যেক প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক শিক্ষক সমাজের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে এ কর্মসূচিতে শরিক হবেন।’  দশম গ্রেডে বেতন ছাড়াও শিক্ষকদের অপর দুই দাবি হলো চাকরির ১০ ও ১৬ বছরে উচ্চতর গ্রেড পাওয়া নিয়ে জটিলতার নিরসন এবং শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির নিশ্চয়তা। পুলিশি বাধার মুখে কর্মসূচি পণ্ড হলে শিক্ষকরা পুনরায় শহীদ মিনারে ফিরে এসে হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

ডিএমপির মিডিয়া শাখা থেকে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, কিছু আন্দোলনকারী ‘কলম সমর্পণ’-এর নামে শাহবাগ থানার সামনে জড়ো হন। বেলা ৪টার দিকে একটি দল পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে শাহবাগ মোড় পার হয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় আন্দোলনকারীরা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কয়েক রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। 

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা ও আশপাশের এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল, গণজমায়েত নিষিদ্ধ থাকলেও আন্দোলনকারীরা তা উপেক্ষা করে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ বাধ্য হয়ে এ ব্যবস্থা নেয়।

‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’ নামে চারটি শিক্ষক সংগঠনের মোর্চার ব্যানারে এ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। মোর্চায় রয়েছে ‘প্রাথমিক শিক্ষক দশম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদ’, ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (কাশেম-শাহিন)’, ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি’ এবং ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি (শাহিন-লিপি)’। 

প্রসঙ্গত, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব বিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৮৪ হাজার শিক্ষক কর্মরত। গত ২৪ এপ্রিল প্রধান শিক্ষকদের বেতন ১১তম থেকে ১০ম গ্রেডে এবং সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৩তম থেকে ১২তম গ্রেডে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু সহকারী শিক্ষকরা সরাসরি দশম গ্রেডের দাবিতে সন্তুষ্ট নন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত