রাজধানী ঢাকার খুব কাছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা। শীতলক্ষ্যার পাড়ের এ উপজেলাটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে এক হাজারের অধিক শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। শিল্প কারখানাকে কেন্দ্র করে উপজেলাটিতে বেড়েছে কারখানা ও আবাসিক স্থাপনার সংখ্যাও। তবে এসব স্থাপনার বেশিরভাগ তৈরির সময় বিল্ডিং কোড মানা হয়নি। যেনতেন করে একটি ভবন তৈরি করে দেওয়া হয়েছে ভাড়া। গত ২১ নভেম্বর ভূমিকম্পে দেয়াল ধসে এক শিশু নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন দুই নারী। এ ছাড়া কয়েকটি স্থাপনায় ফাটল দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীতলক্ষ্যায় নতুন ‘ফল্ট লাইন’ হওয়ায় ওই এলাকা এখন ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে আছে। তাদের ভাষ্য, বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে ধসে পড়তে পারে কয়েক হাজার ভবন ও শিল্প-কারখানা, ধসে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
রূপগঞ্জ উপজেলায় এক হাজারের অধিক শিল্প কারখানা গড়ে উঠলেও বেশিরভাগ কারখানাতেই মানা হয়নি বিল্ডিং কোড। কারখানা কর্র্তৃপক্ষ স্থানীয় পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ছাড়পত্র নিয়ে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো ভবন নির্মাণ করেছে। এতে প্রায় সময়ই কারখানাগুলোতে ঘটে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
গত শুক্রবার ভূমিকম্পে রূপগঞ্জের এ-ওয়ান পোলার, আবুল খায়ের গ্রুপের রবিনটেক্স কারখানা ও ম্যাক্স সোয়েটারসহ বেশ কয়েকটি শিল্প কারখানার ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী এলাকা। পরে শনিবার ফের দুই দফায় হালকা ভূমিকম্প অনূভূত হয়।
এদিকে দফায় দফায় শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় শ্রমিকরা কাজে যোগদান না করে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। পরে প্রশাসন এসে শ্রমিকদের বুঝিয়ে কাজ যোগদান করায়।
এ উপজেলায় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজারের অধিক বহুতল ভবন রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এসব ভবনের বেশিরভাগই অনুমোদনহীন। নকশা অনুমোদন ছাড়াই তৈরি হয়েছে এগুলো। আর যেগুলো অনুমোদন নেওয়া হয়েছে সেগুলোর অনুমোদনও নেওয়া হয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও পৌরসভা কর্র্তৃপক্ষকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে।
সরকারি মুড়াপাড়া কলেজের প্রফেসর নুরুজ্জামান বলেন, ‘অনেক ভবন পুরনো হয়ে গেছে। তারাব চনপাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এগুলোর প্রায় সিংহভাগই ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন অনেক ভবনও ভূমিকম্প প্রতিরোধী নকশা ছাড়া নির্মাণ করা হচ্ছে। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এক থেকে দেড় লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।’
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার এবং সাগরের কাছে হওয়ায় নির্মাণসামগ্রীর কিউরিং প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় ভবনগুলো আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রকৌশলী আক্তার হোসেন বলেন, ‘যেসব ভবন রেট্রোফিটিং করে ঝুঁকিমুক্ত করা সম্ভব, সেগুলো করতে হবে। আর যেগুলো টেকনিক্যালি ঝুঁকিমুক্ত করা সম্ভব নয়, সেগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। উদ্ধারকারী বাহিনীর গাড়ি চলাচল নিশ্চিত করতে সংকীর্ণ সড়কগুলো প্রশস্ত করতে হবে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত নিয়মিত মানুষকে সতর্ক করা।’
তারাব পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ নিগার সুলতানা বলেন, ‘আমাদের ক্ষমতা সীমিত। ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার নেই। অবৈধ ভবন কত আছে এমন পরিসংখ্যান নেই। তবে অবৈধ ভবন চোখে পড়লে নোটিস করি। ব্যবস্থা নিই। আমাদের লোকবল কম। রূপগঞ্জে বড় ভূমিকম্প হলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটতে পারে।’
উপজেলা দুর্যোগ ও ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আইমিন সুলতানা বলেন, ‘আসলে উপজেলা পর্যায়ে কোনো প্রশিক্ষণ নেই। তবে দুর্যোগ প্রশমন দিবসে ভূমিকম্প-সংক্রান্ত মহড়া অনুষ্ঠিত হয়।’
রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট লিটন সরকার বলেন, ‘নকশা ও অনুমোদনবিহীন ভবন তৈরির সঙ্গে নির্দিষ্ট মাপের জায়গা না রেখেই অনেকে ভবন নির্মাণ করেছেন। ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে নির্মাণাধীন ভবনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ অভিযান চলমান থাকবে।’
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, ‘রাজউক অভিযান চালিয়েছিল। আবারও অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
