টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর–বাসাইল) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আহমেদ আযম খানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে ‘পুনর্বাসন’ করার অভিযোগ এনে একযোগে বিএনপির ১১ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন।
মঙ্গলবার গভীর রাত থেকে শুরু করে বেলা ৩টা পর্যন্ত ১১ জন নেতা তাদের পদত্যাগপত্র ফেসবুকে পোস্ট করেন। মুহূর্তেই পদত্যাগের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও একই অভিযোগ এনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের আরও দুই শতাধিক পদধারী নেতা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সম্প্রতি অব্যাহতি পাওয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান সাজু।
একযোগে পদত্যাগ করায় সখীপুরে বিএনপির রাজনীতিতে হঠাৎ ‘ভূমিকম্প’ সৃষ্টি হতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
পদত্যাগকারী নেতারা হলেন, সখীপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান সাজু, সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বাছেদ মাস্টার, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আবদুল মান্নান, উপজেলা বিএনপির সদস্য আশরাফুল ইসলাম বাদল, গজারিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুর রউফ, বহুরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লতিফ মিয়া, গজারিয়া ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব মো. বিপ্লব, গজারিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব মো. মজিবর ফকির, গজারিয়া ইউনিয়ন ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক শামীম, গজারিয়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মো. রবিউল আউয়াল এবং দাড়িয়াপুর ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজিদুর রহমান সাজিদ।
রাতে পাঁচ নেতার পদত্যাগপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এ নিয়ে নানা আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি ‘টক অব দ্য টাউন’-এ পরিণত হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে। সম্প্রতি দল থেকে অব্যাহতি পাওয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান সাজু মঙ্গলবার বেলা ২টার দিকে নিজেও পদত্যাগ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন।
আহমেদ আযম খান বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এবং টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর–বাসাইল) আসনের এবারের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। তিনি এর আগে ২০০১ ও ২০০৮ সালে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।
পদত্যাগপত্র বিশ্লেষণ ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ আসনে বিএনপির তুলনায় আওয়ামী লীগের ভোটার সংখ্যা দ্বিগুণ। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এ কারণে আহমেদ আযম খান নির্বাচনে তাদের ভোট টানতে উপজেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাকর্মীর সঙ্গে কয়েক দফা গোপন বৈঠক করেছেন। দলীয় বিভিন্ন প্রচার–প্রচারণা, সভা–সমাবেশে তাঁরা (আ. লীগ) সামনের সারিতে বসছেন। কেউ কেউ বক্তব্যও দিচ্ছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ওপর হামলার অভিযোগে যাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে—এমন অনেকেই এসব সভায় যুক্ত হচ্ছেন। পদত্যাগকারী নেতাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করায় তারা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। সব পদত্যাগপত্রের ভাষা প্রায় একই।
পদত্যাগ প্রসঙ্গে সখীপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বাছেদ মাস্টার বলেন, “কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছি, আযম খান আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে ভোট পাওয়ার আশায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুরুত্ব বেশি দিচ্ছেন। তাদের সামনের সারিতে চেয়ার দিচ্ছেন। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে নেতা আমাদের বহিষ্কারের হুমকি দিচ্ছেন।”
অব্যাহতি পাওয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান সাজু দেশ রূপান্তরকে বলেন, “আযম খান গত বুধবার টাঙ্গাইল জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক খালেক মন্ডলকে হুমকি ও গালাগাল করেছেন। গত রবিবার রাতে মুক্তিযুদ্ধের ৫৪ বছর পর হঠাৎ নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রচার করেছেন। গত ১৭ বছর দলের জন্য জেল–জুলুম খেটেছি, আওয়ামী লীগের নির্যাতন সহ্য করেছি। অথচ তিনি সেই স্বৈরাচারের দোসর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করছেন, তাদের সামনের সারিতে স্থান দিচ্ছেন। নেতার এসব কর্মকাণ্ডে আমরা অপমান বোধ করছি।”
তিনি আরও জানান, “আজ–কালকের মধ্যে বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের আরও দুই শতাধিক পদধারী নেতা পদত্যাগ করবেন। ইতিমধ্যে তারা আমার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।”
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নাজিম উদ্দিন বলেন, “দলকে বিতর্কিত করতে দলের ভেতর একটি পক্ষ গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে যাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তারা বিষয়টি টের পেয়ে আগেই পদত্যাগ করলেন। তাঁরা পরিকল্পিতভাবে আহমেদ আযম খানকে বিতর্কিত করার জন্য মাঠে নেমেছেন।”
পদত্যাগ বিষয়ে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, “সামনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এটি একটি গভীর ষড়যন্ত্র। কেন্দ্রের নির্দেশে শাহজাহান সাজুর বিভিন্ন অনিয়মের কারণে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, কিন্তু আমরা তাকে বহিষ্কার করিনি। কিছু নেতাকর্মী নিয়ে তিনি চাপ সৃষ্টি করেছেন পদ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু এ পদ ফিরিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার তার নয়। এর মালিক কেন্দ্রীয় বিএনপি ও জেলা বিএনপি। দলের স্বার্থে ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। পদত্যাগপত্র এখনো গ্রহণ করা হয়নি। ভবিষ্যতে তাঁদের কর্মকাণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হবে।”
আহমেদ আযম খানের ব্যক্তিগত মোবাইলে কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এ বিষয়ে তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ নেতা জানান, দলীয় নেতাকর্মীদের পদত্যাগ ও পদত্যাগের হুমকি নিয়ে তিনি বিব্রত। এ কারণেই তিনি সাংবাদিকদের ফোন ধরছেন না।
