আবু সাঈদ হত্যা মামলায় জবানবন্দিতে হাসনাত

গোয়েন্দাদের আন্দোলন দমনে ক্রেডিট নেওয়ার প্রতিযোগিতা ছিল

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৯:১৮ পিএম

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ।

আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এ তিনি জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের বর্ণনা দেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন তিনি।

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আন্দোলনের সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই)-এর সদস্যরা তাদের তুলে নিয়ে যায়। আন্দোলন দমনে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে ‘ক্রেডিট’ নেওয়ার প্রতিযোগিতা তিনি প্রত্যক্ষ করেন। 

এ মামলার তিনি ২৩তম সাক্ষী। এর আগে গত ২৮ আগস্ট প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের সময় গত বছরের ১৬ জুলাই বেরোবির সামনে পার্ক মোড়ে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে গুলি করে পুলিশ। শহীদ আবু সাঈদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। 

এ হত্যাকাণ্ডের পর সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ প্রতিবাদে সোচ্চার হন। এর ধারাবাহিকতায় গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। 

আবু সাঈদ হত্যার তদন্ত শেষে ৩০ জনকে আসামি করে দেওয়া প্রতিবেদন গত ৩০ জুন ট্রাইব্যুনাল আমলে নেয়। এ মামলায় ছয় আসামি বর্তমানে কারাগারে।

জবানবন্দিতে হাসনাত আব্দুল্লাহ আরও বলেন, ‘গত বছরের ১৭ জুলাই আন্দোলন চলাকালে রাতে ডিজিএফআই সদস্যরা আমার বাসার সামনে এসে সারজিস আলম (বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও এনসিপির অন্যতম সমন্বয়ক) এবং আমাকে তুলে নিয়ে যায়। 

আমরা যেতে না চাইলে পরিবারসহ ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়। ওই রাতেই আমাদের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক, প্রতিমন্ত্রী এ. আরাফাত এবং শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল উপস্থিত ছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘ডিজিএফআই সদস্যরা আমাদের মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে চাপ দেয়। কিন্তু আমরা অন্য সমন্বয়কদের ছাড়া বৈঠকে রাজি না হওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ হয়। 

এরপর আমাদের বাসায় না ফিরিয়ে মৎস্য ভবন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মাঝামাঝি একটি গোপন স্থানে-যা “সেফ হাউস” নামে পরিচিত-সেখানে আটকে রাখে। সেখানে ডিজিএফআই’র লোকজন আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৮ জুলাই সারাদিন আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় ডিজিএফআইয়ের ডিজিসহ কয়েকজন কর্মকর্তা সেফ হাউসে এসে সর্বশেষবারের মতো আন্দোলন প্রত্যাহারের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।’

হাসনাত আব্দুল্লাহ জানান, ‘এসবি, এনএসআই, ডিজিএফআই, ডিবি—সব ধরনের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে আন্দোলন দমনে ক্রেডিট নেওয়ার প্রতিযোগিতা দেখতে পাই।’

জবানবন্দিতে তিনি আবু সাঈদ হত্যার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, বেরোবি প্রশাসন এবং যারা আবু সাঈদকে গুলি করেছে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। 

পাশাপাশি আবু সাঈদসহ আন্দোলনে নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আবেদন করেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত