নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার পশ্চিম উপকূলে মেঘনার কোলঘেঁষে জেগে ওঠা চর আতাউরসহ অন্তত তিনটি চরে চলছে প্রকাশ্য জবরদখলের মহোৎসব। এতে করে কয়েক দশক ধরে গরু-মহিষের চারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত বিস্তীর্ণ এলাকা আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একই সঙ্গে হুমকির মুখে পড়েছে বন বিভাগের কেওড়া বাগান।
হাতিয়ার তমরদ্দি ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে মেঘনার তীর ঘেঁষে অবস্থিত বিশাল চরটির নাম চর আতাউর। চারদিকে শত শত গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার বিচরণে এক সময় প্রাণবন্ত এই চরটি দীর্ঘ দেড় দশক ধরে স্থানীয় ‘বাতাইন্যা’ (রাখাল) দের জীবিকার প্রধান ভরসা। তবে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই একটি প্রভাবশালী মহল পরিকল্পিতভাবে চরটিতে মাটির স্তুপ তৈরি করে দখলের চিহ্ন বসাতে শুরু করেছে। বাতাইন্যাদের বসতঘর ঘিরে ফেলা হচ্ছে দখলচিহ্ন দিয়ে, অনেককে গবাদিপশু নিয়ে চর ছাড়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় ও বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চর আতাউরের পাশাপাশি একই অবস্থা বিরাজ করছে ঘাসিয়ার চর (ঘাইস্যার চর) ও জাগলার চরেও। তমরদ্দি ও চরকিং ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে মেঘনার পশ্চিম তীরে সমান্তরালভাবে অবস্থিত এসব চর বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন। তবে হাতিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সীমিত জনবল নিয়ে জবরদখল ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে বন বিভাগ।
সম্প্রতি সরেজমিনে চর আতাউরে গিয়ে দেখা যায়, চরের উত্তর দিক থেকে সারিবদ্ধভাবে মাটির স্তুপ তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি স্তুপে গাছের ডাল পুঁতে দখলের চিহ্ন বসানো হয়েছে। কয়েকটি স্থানে বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, টাকার বিনিময়ে এসব জমি পরিমাপ করে প্রভাবশালীদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, চরের উত্তর ও মধ্য অংশে বাতাইন্যাদের অস্থায়ী বসতি রয়েছে। দক্ষিণে রয়েছে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্প ও দুটি গুচ্ছগ্রাম, যেখানে প্রায় ৪০০ পরিবার বসবাস করে। অথচ পুরো এলাকায় কোনো স্থায়ী প্রশাসনিক কার্যালয় নেই। নদী পার হয়ে মূল ভূখণ্ড থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আসতে হয়।
মহিষের বাতাইন্যা আবু সোলায়মান জানান, গত বর্ষা মৌসুম থেকেই দখলের তৎপরতা শুরু হয়। বাধা দিলে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে দখলদারদের কাছ থেকে গরু-মহিষ পালনের অনুমতি নিতে হয়েছে। এই সমঝোতায় স্থানীয় এক ইউপি সদস্য ও কয়েকজন প্রভাবশালী ভূমিকা রাখেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বাতাইন্যা নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘গত ১০ বছরে কেউ চর দখলের চেষ্টা করেনি। সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই বিভিন্ন গ্রুপ এসে বন বিভাগের জমি দখল করছে। এভাবে চললে কেওড়া বন উজাড় হয়ে যাবে।’
মহিষের মালিক নুরুল ইসলাম ও রাশেদ জানান, তারা প্রায় ১৫ বছর ধরে এখানে গবাদিপশু পালন করছেন। জোয়ারের সময় আশ্রয়ের জন্য মাটির কিল্লা ও পুকুর খনন করেছেন। এখন দখলদাররা তাদের চর ছাড়তে চাপ দিচ্ছে এবং মারধরও করছে। তারা চরটিকে সরকারিভাবে গবাদিপশুর চারণভূমি ঘোষণার দাবি জানান।
চর দখলের অভিযোগে নাম আসা চরকিং ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য মনির উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন হাতিয়ার বাইরে ছিলাম। চর দখলের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কেউ আমার নাম ব্যবহার করলে তার দায় আমি নেব না।’
এ বিষয়ে নলচিরা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আল আমিন গাজী জানান, একটি গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে চর আতাউরের জমি দখলের চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে চারজনকে আটক করে মামলা করা হয়েছে। তবে নদীবেষ্টিত এলাকা হওয়ায় নিয়মিত অভিযান চালানো কঠিন। তিনি উপজেলা প্রশাসন ও কোস্টগার্ডের সহায়তা চেয়েছেন।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলউদ্দিন বলেন, ‘বন বিভাগ ও গবাদিপশুর মালিকদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়েছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে যৌথ অভিযান চালিয়ে চরগুলো দখলমুক্ত করা হবে।’
