পাহাড় কাটছে ইয়াবা কারবারীরা, নিরব প্রশাসন

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম

কক্সবাজারের টেকনাফে ইয়াবা কারবারীদের দৌরাত্ম্য নতুন রূপ নিয়েছে। মাদক কারবারের পর এবার তারা নেমেছে সরকারি পাহাড় দখল ও নির্বিচারে পাহাড় কাটার মহোৎসবে। প্রকাশ্যে দিনের আলোতে কোনো রকম বাধা ছাড়াই উঁচু উঁচু পাহাড় কেটে সাবাড় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে বেপরোয়া মাদক কারবারীর বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের অভিযোগ,একাধিক মাদক মামলার আসামি হয়েও প্রশাসনের চোখের সামনে পরিবেশ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালী ইয়াবা কারবারীরা। অথচ দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের দক্ষিণ কানজর পাড়া এলাকার পশ্চিমে সরকারি মালিকানাধীন পাহাড় দেদারসে কাটা হচ্ছে। এই পাহাড় কাটা ও দখলের মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে সৈয়দ নুর প্রকাশ নুরুল আমিন ওরফে ট্রলি আমিনের নাম। তিনি ওই এলাকার কবির আহমদের ছেলে এবং এলাকাজুড়ে একজন চিহ্নিত ইয়াবা কারবারী হিসেবে পরিচিত।

স্থানীয়দের দাবি ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ট্রলি আমিনের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে এবং অতীতে কয়েকবার ইয়াবাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটকও হয়েছে। তবে এসব মামলার পরও কীভাবে তিনি প্রকাশ্যে পাহাড় কাটার মতো গুরুতর অপরাধে যুক্ত হচ্ছেন, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। পাহাড়খেকো এই মাদক কারবারী পরিকল্পিতভাবে সরকারি পাহাড় দখল করে সেখানে শ্রমিক ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দিনদুপুরে মাটি কেটে নিচ্ছে। পাহাড় কাটা মাটি বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করা হচ্ছে এবং জমি ভরাটের কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পাহাড় কাটার টাকা আবার বিনিয়োগ হচ্ছে ইয়াবা কারবারে। ফলে একদিকে যেমন পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে মাদকচক্র আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠছে।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, পাহাড় কাটার ফলে শুধু প্রকৃতি নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাপনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, পাহাড় কেটে মানুষের চলাচলের পুরনো পথও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে করে স্কুলগামী শিক্ষার্থী, নারী ও বৃদ্ধদের দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প পথে চলাচল করতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুম এলেই আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। পাহাড় কেটে দুর্বল হয়ে পড়া মাটি যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে,এই আশঙ্কায় দিন কাটছে স্থানীয় প্রতিবেশীদের। তবুও পাহাড়খেকো বেপরোয়া ইয়াবা কারবারী ট্রলি আমিনের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস করছে না স্থানীয়রা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি এইচ এম এরশাদ বলেন, টেকনাফের পাহাড় কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ নয়, এটি পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পাহাড় কেটে ফেললে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু এসব বিষয় উপেক্ষা করেই অব্যাহত রয়েছে পাহাড় ধ্বংসের এই মহোৎসব।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই পাহাড় কাটা কোনো গোপন কর্মকাণ্ড নয়। প্রকাশ্যে দিনের পর দিন এই কাজ চললেও স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা চরমে পৌঁছেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তবে কি টেকনাফে আইন শুধু দুর্বলদের জন্য? প্রভাবশালী মাদক কারবারীদের জন্য কি আইন অকার্যকর?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ট্রলি আমিন একজন পরিচিত ইয়াবা কারবারী। তার বিরুদ্ধে মামলা আছে, তিনি ইয়াবাসহ প্রশাসনের হাতে ধরাও পড়েছেন একাধিকবার। কিন্তু এখন তিনি পাহাড় কেটে আমাদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলছেন। কেউ প্রতিবাদ করলে হুমকি দেয়। আমরা সাধারণ মানুষ চুপ থাকা ছাড়া উপায় দেখছি না।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা জানান, পাহাড় কাটা মানে শুধু মাটি কাটা নয়, এটা আমাদের ভবিষ্যৎ কাটা। কিন্তু প্রশাসনের কেউ যেন দেখছেও না।

সচেতন মহলের দাবি, টেকনাফে মাদক কারবারীরা এখন বহুমুখী অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। ইয়াবা ব্যবসার পাশাপাশি পাহাড় দখল, বন উজাড় ও ভূমি বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রভাব আরও বাড়াচ্ছে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে টেকনাফ পুরোপুরি অপরাধ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইন অনুযায়ী সরকারি পাহাড় ও বনভূমি কাটা পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বন আইনে গুরুতর অপরাধ। এসব অপরাধের জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে বলে মনে করছেন তারা।

স্থানীয়রা জানান, প্রশাসনের নীরবতা এই অপরাধীদের জন্য কার্যত একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করে দিয়েছে। দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে টেকনাফের পাহাড়, পরিবেশ ও জনজীবন ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

অবিলম্বে পাহাড় কাটা বন্ধ করে অভিযুক্ত ইয়াবা কারবারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে এবং টেকনাফকে মাদক ও ভূমিদস্যুদের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জোর হস্তক্ষেপ কামনা করেন স্থানীয়রা। না হয় ইতিহাসে টেকনাফকে পাহাড়হীন, আইনহীন এক জনপদ হিসেবে মনে রাখবে বলেও জানান তারা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে আমিনের বাড়িতে গেলেও তাকে না পাওয়ায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের অতিরিক্ত পরিচালক জমির উদ্দিন জানান, কেউ পাহাড় কাটলে আইনগতভাবে মামলা দেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত