রাজনৈতিক চাপে মোস্তাফিজকে ছেড়ে দিল কেকেআর

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:২৫ এএম

রাজনীতির বলি হলো ক্রিকেট। রাজনৈতিক চাপে কলকাতা নাইট রাইডার্স ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো মোস্তাফিজুর রহমানকে। ১৬ ডিসেম্বর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের খেলোয়াড় নিলাম থেকে মোস্তাফিজকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে কিনেছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। দিল্লি ক্যাপিটালস ও চেন্নাই সুপার কিংসকে অর্থের লড়াইতে পেছনে ফেলে এই বামহাতি পেসারকে নিয়েছিল কলকাতা ফ্র্যাঞ্চাইজি। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে মোস্তাফিজকে স্কোয়াড থেকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো কেকেআর।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে চলতে থাকা রাজনৈতিক অস্থিরতা, কিছু কিছু ব্যক্তির ভারতবিরোধী বক্তব্য, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিন্দু ধর্মের একজনের মৃত্যুসহ বেশ কিছু ঘটনাপ্রবাহে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। মোস্তাফিজকে দলে নেওয়ায় হিন্দু আধ্যাত্মিক গুরু শ্রী জগৎগুরু স্বামী রামভদ্র আচার্য কেকেআরের সিংহভাগ অংশীদার শাহরুখ খানকে বলেছেন বিশ্বাসঘাতক। আরেক হিন্দু ধর্মগুরু দেভকীনন্দন ঠাকুর শাহরুখকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন মোস্তাফিজকে এতগুলো টাকা না দিয়ে খুন হওয়া হিন্দুদের সন্তানদের এই টাকা দান করতে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠন শিবসেনা শাহরুখকে হুমকি দিয়েছে, বিশ্বাসঘাতক বলেছে। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির পশ্চিমবাংলার নেতা কৌস্তভ বাগচি হুমকি দিয়েছে, ‘বাংলাদেশের কোনো খেলোয়াড়কে যদি আইপিএল দলে রাখা হয় এবং সে যদি কলকাতায় খেলে, আমরা সেটা হতে দেব না। শাহরুখকেও আমরা কলকাতায় আসতে দেব না। মোস্তাফিজ কোটি কোটি টাকা কামিয়ে বাংলাদেশে পাঠাবে, সেই টাকায় অস্ত্র কিনে আমাদের হিন্দু ভাইদের মারা হবে এটা হতে দেওয়া যায় না।’

উগ্র হিন্দুত্ববাদী এই ধরনের হিংসাত্মক বক্তব্যের পরই গতকাল শনিবার বিসিসিআই সেক্রেটারি দেবজিৎ সাইকিয়া গণমাধ্যমকে জানান, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে, যা সবদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, বিসিসিআই কলকাতা নাইট রাইডার্স ফ্র্যাঞ্চাইজিকে নির্দেশ দিয়েছে, তাদের একজন খেলোয়াড়, বাংলাদেশের মোস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে ছেড়ে দিতে। তাদের এটাও বলা হয়েছে, তারা যদি কোনো বিকল্প খেলোয়াড় চায়, তাহলে বিসিসিআই বিকল্প খেলোয়াড় নেওয়ার জন্য অনুমোদন দেবে।’ পরে কেকেআর স্কোয়াড থেকে মোস্তাফিজকে বাদ দিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অন্তিম যাত্রায় এসে শোক প্রকাশের তিন দিনের মাথায় বিসিসিআই-এর এমন সিদ্ধান্ত জন্ম দিয়েছে নানান প্রশ্নের। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি বাংলাদেশের বিশ্বকাপকে ঘিরে। ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখে শুরু হওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অন্তত ৪টি ম্যাচ বাংলাদেশ খেলবে ভারতে, যার ৩টি কলকাতায় এবং একটি মুম্বাইতে। এই দুই শহরের বিজেপি, শিবসেনাসহ উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোই মোস্তাফিজকে আইপিএল দল থেকে বাদ দেওয়ার জোরালো দাবি তুলেছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাত এবং রাজনৈতিক সংকটের কারণে ভারত-পাকিস্তান একে অন্যের মাটিতে মুখোমুখি হয় না, খেলে নিরপেক্ষ ভূমিতে। পাকিস্তানের টি-২০ বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো হবে শ্রীলঙ্কায়। বাংলাদেশের ম্যাচগুলোও কি সেখানে স্থানান্তর হবে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে। এছাড়াও ২০২৫ সালে স্থগিত হওয়া ভারতের বাংলাদেশ সফরের ৩টি ওয়ানডে ও ৩ টি-টোয়েন্টি এই বছরই হওয়ার কথা জানিয়েছে বিসিবি, ম্যাচগুলোও হবে সেপ্টেম্বরের ১, ৩ ও ৬ তারিখে এবং ৯,১২ ও ১৩ তারিখে। দ্বিপাক্ষিক সিরিজও শেষ পর্যন্ত মাঠে গড়াবে কি না তা নিয়েও জেগেছে প্রশ্ন।

মোস্তাফিজকে এভাবে দল থেকে বাদ দেওয়ার তীব্র সমালোচনা যেমন হয়েছে ভারতের ক্রিকেটাঙ্গনে, তেমনি সমর্থনও আছে। সাবেক ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার আকাশ চোপড়া বলেছেন তিনি এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। সরকার ভুল করলে জনগণকে ভুগতে হয়। পাকিস্তানের ক্রিকেটাররাও তো সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িত নন, কিন্তু তারাও তো আইপিএলে সুযোগ পাচ্ছেন না। ১৯৮৩’র বিশ্বকাপজয়ী সাবেক ক্রিকেটার মদনলাল মনে করেন, মোস্তাফিজ পরিস্থিতির শিকার, ‘বিসিসিআই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারণ, তাদের চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা কারও নেই। এমনকি শাহরুখ খানেরও না; কিন্তু খেলাধুলায় কেন এত রাজনীতি ঢুকছে? আমি জানি না ক্রিকেট কোন দিকে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই ওপর মহল থেকে চাপ ছিল। বাংলাদেশে যা ঘটছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক, কিন্তু খেলোয়াড়দের কেন এর মাঝখানে টেনে আনা হচ্ছে? এখানে শাহরুখ খানের দোষ কোথায়? নিলামে তো একটা কমিটি বসে খেলোয়াড় নির্বাচন করে।’ সাবেক ক্রিকেটার ও রাজনীতিবিদ, তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে লোকসভার সদস্য কীর্তি আজাদ বলেছেন, আইপিএলে কারা খেলবে, কাদের নাম নিলামে উঠবে এসব ঠিক করে বিসিসিআই। নিলামের সময় বিসিসিআই সচিব ছিল জয় শাহ। এখন কেউ যদি বিশ্বাসঘাতক হয়, সেটা জয় শাহ এবং বিসিসিআই।’

বাংলাদেশেও তীব্র সমালোচনা হচ্ছে বিসিসিআই-এর এমন সিদ্ধান্তের। সাবেক অধিনায়ক রাজিন সালেহ বলেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের আইপিএল বয়কটের কথা। যদিও বাংলাদেশ থেকে আইপিএলে খুব বেশি প্রতিনিধিত্ব দেখা যায় না। সাকিব আল হাসান এবং মোস্তাফিজকে বাদে বাংলাদেশ থেকে যারাই আইপিএলে ডাক পেয়েছেন (মাশরাফী, আশরাফুল, রাজ্জাক, লিটন, তামিম) কেউই এক ম্যাচের বেশি খেলতে পারেননি, কেউ কেউ মাঠেই নামেননি। মোস্তাফিজ নিয়মিতই সুযোগ পেয়েছেন, ২০১৬-তে অভিষেকের পর খেলেছেন ৮ মৌসুম। এবার দল পাওয়ার পর তাকে যে পরিস্থিতিতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো কেকেআর, তাতে ধারণা করা যায় রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণ না হলে আইপিএলের দরজা বন্ধই হয়ে যেতে পারে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত