বিষয় সামান্য

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪৬ এএম

আজকাল অসামান্য বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে বিশাল ক্যানভাসের প্রয়োজন হয়। সেখানে যুক্তিতর্কের এত বাড়াবাড়ি থাকে যে ঐহিক, দৈহিক, পারিবারিক এবং পারত্রিক নানা সমস্যায় ঘুরপাক খাওয়া অতি ব্যস্ত পাঠকের জন্য, লেখা বড় করা যায় না। পাঠকের সময় কম পড়ার। মাথার হার্ডডিস্কে স্পেস কম ধারণ করার। বড় লেখায় কাজের কথা খুঁজতে গিয়ে, অনেকে অস্থির ও অধৈর্য হয়ে পড়েন। ফলে লেখকের শ্রম সার্থক হওয়ার সুযোগ সেখানে কম। জাপানে বড় ও মাঝারি কবিতার সারমর্ম ‘হাইকু’র মধ্যে ঢোকানো হয়ে থাকে, যাতে পাঠক তিন লাইনের ‘হাইকু’ কবিতার মধ্যে ভাবের নদী ও সাগর সিঞ্চন করতে পারেন। দেশ-সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতিতে এখন এমন কোনো খাত বা ক্ষেত্র বা বিষয় নেই, যেখানে সমস্যারা একসঙ্গে বসে শুধু পান-বিড়ি খায় না, পরস্পরের পিঠ চুলকানিতেও কম যায় না। ফলে সমস্যার আসল চেহারা কিম্ভূতকিমাকার আকার ধারণ করে। আর সমস্যাদের সমাধানের মা ভাগে, গঙ্গা পদ্মা মেঘনা মধুমতি কিছু পায় না। একজন পরিবেশ আইনবিদ এখন নিজেই নিজের আর্জির পক্ষে সওয়াল জবাবে যান না, সুখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সংস্কৃতিতে সংস্কার করতে হিম্মত হারিয়ে ফেলেন, যেন ডজনখানেক অর্থনীতিবিদ অর্থনীতিকে সুচিকিৎসা দিতে এসে প্রেসক্রিপশানই লেখার সময় হারিয়ে ফেলেন। বৈষম্য দূর করার নামে বৈষম্যের জ¦লজ্যান্ত উদাহরণ উদ্গিরণ করেন তখন বড় লেখা দিয়ে পাঠকের চিন্তাচেতনায় চাবুক মারা যায়? যায় না। তাই বড় বড় সমস্যাকে বড় ব্যর্থতা বা সফলতার সালতামামি স্বল্প কথায় ‘নির্বাহী সারসংক্ষেপ’ আকারে কিংবা বড় গবেষণা কর্মের ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট’ আকারে জনতার আদালতে আনা সুবিবেচনাপ্রসূত উপায় বলে মনে করা যেতে পারে।

১. মোঘল আমলে ঢাকা শহর ছিল অসংখ্য খাল ও জলাধারের শহর। যে কারণে শহরের বাতাসে সিসার কণা বা বিষাক্ত বাতাসের পরিমাণ ছিল অতি নিম্ন পর্যায়ে। ক্রমান্বয়ে ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং বর্তমান বাংলাদেশের ৫৪ বছরে সেসব নদী ও খাল সীমিত হতে হতে এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শ্বাস-প্রশ্বাসেও দূষিত পদার্থের সুঘ্রাণ শুঁকতে হচ্ছে। দূষিত বাতাস বাড়ছে ব্যাপকভাবে। কসমপলিটন শহরে সর্বশেষ অবলম্বন হিসেবে, হাতির ঝিলের জলাধার রক্ষা ও চারপাশে সবুজ বেষ্টনী ও সার্কুলার পথ ও ফুটপাত তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০৬-২০০৮ সালে। মূল পরিকল্পনায় ছিল, সোনারগাঁও হোটেল থেকে শুরু হয়ে ঝিলটি গুলশান অবধি পানিপথ তৈরি হবে যাতে মগবাজার থেকে গুলশান পর্যন্ত নিয়মিত যাতায়াতের নৌপথ থাকবে, ঝিলের ভেতরে একটি দ্বীপ, পাখ-পাখালিদের অভয়ারণ্য হিসেবে তৈরি করা হবে যেখানে জনমানবের যাওয়ার পথ থাকবে না ইত্যাদি। সোনারগাঁও হোটেলের পেছনের জলাধারটি অক্ষুন্ন ও গতিশীল রাখা যায়নি। সেখানে মাটি ভরাট করে এক্সপ্রেসওয়ে তৈরির পথ সুগম করা হয়েছে। পরিবেশ আন্দোলনকারীরা একসময় এ নিয়ে উচ্চবাচ্চ্য করলেও, এখন তারা নিজেরাই পরিবেশ ধ্বংসের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে মনে হয়। গুলশান অবধি লেকগুলো খনন করা হলেও, সেগুলোকে মূল লেকের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়নি, হয়নি নৌপথের বিস্তার (একমাত্র গোদারাঘাট অবধি ছাড়া)। হাতিরঝিল এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ ও এর সার্বিক দেখভালের জন্য সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বিশেষ ইউনিট/ দপ্তর স্থাপন, থানা স্থাপন, বিশাল গাড়ি পার্ক ভবন, অ্যাপার্টমেন্টসহ সবই করা হয়েছে। কিন্তু লেকের পানি নিয়মিত পরিশোধনের বিষয়ে এবং লেকের পাড় পরিষ্কার ও সার্বিক পরিবেশ সযত্ন কার্যক্রমে অযত্ন অবহেলা লক্ষণীয়। ইতিমধ্যে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ কয়েক দফায় সারা হয়েছে। গাছগুলোর পরিচর্যা এবং নান্দনিক সবুজ বেষ্টনী পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে যত্ন আর্তির অভাব চোখে পড়ে। হাতিরঝিল মেট্রোপলিটন নাগরিকদের ব্যায়াম ও বিশ্রামের বস্তুতে পরিণত হলেও মাঝে মাঝে মনে হবে হাতিরঝিল যেন আর দশটি অমনোযোগে ভরা স্থাপনা।

২. কুড়িল বিশ্বরোড (৩০০ ফুট সড়ক) দুপাশে বেশ বড়সড় নর্দমা বা খাল কাটা হয়েছে। খালপাড়ের ফুটপাতে কিছুক্ষণ পরপর রাজউক ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নামফলক লাগানো হয়েছে। তাতে এই নর্দমা ওরফে পানিপথটির গাম্ভীর্য ও গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই পানিপথটি ছোট নৌযান চলাচল উপযোগী করে তোলা হলে কুড়িল থেকে কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত পর্যটনের একটি নান্দনিক নৌপথ তৈরি হতে পারত। আশপাশে বড় বড় শহরে ইউরোপের প্রায় দেশে শহরের মধ্য দিয়ে পর্যটনের সুযোগ বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করে। এই খাল দিয়ে নৌচলাচলে প্রধান সমস্যা হলো, মাঝে মাঝে খালের ওপর ওভারব্রিজ করা হয়েছে। ওভারব্রিজগুলো একটু উঁচু করে তৈরি করা হলে, তার নিচ দিয়ে নৌযান যেতে পারত। এখন সেই ধরনের পরিবর্তন কঠিন হবে এবং দৃশ্যমান করাও যাবে না। বলার বিষয় হলো, নর্দমা বা খাল নির্মাণের পরিকল্পনায় দূরদর্শিতার ঘাটতি বা অসহযোগিতা অমনোযোগিতা ছিল। শহরের মধ্যে বা পার্শে¦ নৌচলাচলের অবকাঠামো বা ভৌত সুযোগ সৃষ্টির সময় পুরো পরিস্থিতির বহুমুখী সুযোগ-সুবিধাগুলো নিশ্চয়নের ব্যবস্থা থাকা উচিত। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য থাকার সময়, আমি নিজে নদীর গভীরতা মেপে শীতলক্ষ্যা থেকে বালু নদী, তুরাগ হয়ে বুড়িগঙ্গা নদী ঘিরে যে সার্কুলার নৌপথ নির্মাণ প্রকল্প তৈরি ও পাস করা হয়েছিল সেটির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে এসব সীমাহীন ব্যর্থতার বজরা আর কত ভারী করা হবে, সেটা অনুসন্ধান করা দরকার।

৩. কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টসহ দেশে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান ও সংযোজনের সুযোগকে আরও সহজ ও কার্যকর করার জন্য সরকার সম্প্রতি ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন (১৯৯৯ সালের ৫নং আইন) রহিতক্রমে মানবদেহে সংযোজনের নিমিত্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও উহার আইনানুগ ব্যবহার নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে’ অধ্যাদেশ নং ৬৬, ২০২৫ (১৯ নভেম্বর ২০২৫) জারি করা হয়েছে। এখানে কিডনি ছাড়াও অন্যান্য যেকোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্রেন ডেথ রোগী, নিকটাত্মীয় কিংবা নিঃস্বার্থবাদী দাতাদের কাছ থেকে গ্রহণ ও সংযোজন সম্পর্কে বিস্তারিত নীতি ও পদ্ধতি প্রক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে নির্দেশিত হয়েছে। এটি ১৯৯৯ সালের ২৬ বছর পর অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ আকারে জারি করেছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। বিগত দুই যুগে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিবেশ প্রেক্ষাপটে এই আইনটির আধুনিক সংশোধিত সংস্করণ বিশেষ তাৎপর্য ও অর্থবহ ভূমিকা পালনে সহায়ক হবে। তবে এই জাতীয় আইন তৈরির সময় সূক্ষ্ম খুঁটিনাটি বিষয় দেখভালের জন্য আমলাতান্ত্রিক মনোভাব এর চেয়ে ইতিবাচক ও সহায়তামূলক দৃষ্টিভঙ্গির উপস্থিতি থাকা বাঞ্ছনীয়। কেননা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিতে নিতে বিদেশ যেতে হলে ৩-৪ গুণ বেশি খরচ (বৈদেশিক মুদ্রায়) বহন করতে হয়। অর্থাৎ দেশের অভ্যন্তরে কিডনি, লিভার, হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টের মতো ক্রমবর্ধমান রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে রোগীর মাথাপিছু খরচ অনেকাংশে কম হতে পারবে। সাশ্রয় ঘটবে বিদেশি কারেন্সি ব্যয়। ব্রেন ডেথ কিংবা নিকটাত্মীয় রোগীদের কাছ থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আদান-প্রদানের ব্যবস্থা মূলত আগের আইন থেকে বহাল ছিল বা আছে। বছর দুই আগে নিকটাত্মীয়দের সংজ্ঞা প্রসারিত করা হয়েছে। এবারের আইনে ‘নিঃস্বার্থবাদী দাতা’র নিকট থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেওয়ার ও সংস্থাপনের সুযোগটি নতুন যোগ করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় সংযোজন। তবে নিঃস্বার্থবাদী দাতা নির্বাচন, তার দায়দায়িত্ব এবং অঙ্গ আদান-প্রদান কাজে অনুমতি গ্রহণের পদ্ধতি প্রক্রিয়াকে জটিল করার পরিবর্তে সহজে পরিপালনীয় করার অবকাশ রয়েছে। প্রতিবেশী দেশে গিয়ে যেকোনো মূল্যে (৫-৬ গুণ বেশি) টাকা দিয়ে দাতার কাছ থেকে অঙ্গ কেনা যেত। এখন দেশেও যদি নানান জটিল প্রক্রিয়া তথ্য দিতে গিয়ে হয়রানি ও ব্যয়বৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়ে তাহলে গণস্বাস্থ্যসেবার মহৎ উদ্দেশ্য পূরণ কষ্টকর হবে। এ ব্যাপারে ভেতর-বাইরের নিরুৎসাহিতকরণ অভিসন্ধি থাকতে পারে। জনস্বাস্থ্যসেবা ও সুলভে সুচিকিৎসা প্রাপ্তি সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনাবেচা ও সংযোজনের ক্ষেত্রে প্রতারণা বঞ্চনা প্রতিরোধের জন্য সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে ন্যূনতম ব্যবস্থাপনা অবশ্যই থাকা উচিত, তবে তা যেন চলার পথকে বন্ধুর করতে না পারে, সেটি বিবেচনায় রাখা আবশ্যক হবে।

লেখক: সাবেক সচিব ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত