সাতক্ষীরায় স্বামী বিবেকানন্দের ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০৬ পিএম

“বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি”– এই অমরবাণীকে সামনে রেখে সাতক্ষীরায় নানা মানবসেবামূলক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয়েছে যুবনায়ক স্বামী বিবেকানন্দের ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় শহরের ঐতিহ্যবাহী মায়েরবাড়িতে বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদের উদ্যোগে আলোচনা সভা, শীতবস্ত্র বিতরণ এবং মানবকল্যাণমূলক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয় রামকৃষ্ণ মন্দির ও ধ্যানঘরে বিশেষ প্রার্থনা সভার মাধ্যমে। এরপর মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বালন করে অনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়।

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তৃপ্তিমোহন মল্লিক স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও দর্শনভিত্তিক গান পরিবেশন করেন। আলোচনা সভার সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক তপন কুমার শীল, এবং সাধারণ সম্পাদক বিশ্বরূপ চন্দ্র ঘোষ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা মন্দির সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সোমনাথ ব্যানার্জী।

অ্যাডভোকেট সোমনাথ ব্যানার্জী বলেন, ‘স্বামী বিবেকানন্দ ধর্মকে শুধুমাত্র উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মানবসেবা তিনি ঈশ্বরসেবার সমান মর্যাদা দিয়েছেন। আজকের সমাজে যে বিভাজন ও সহিংসতার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা মোকাবিলায় তাঁর সহায়তা ও সমন্বয়ের দর্শন আমাদের পথপ্রদর্শক।’

সারদা সংঘ সাতক্ষীরার সভাপতি শ্রীমতি কল্যাণী রায় বক্তব্যে বলেন, ‘মাত্র ৩৯ বছরের জীবনে স্বামী বিবেকানন্দ যে দর্শন রেখে গেছেন, তা যুগে যুগে মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। তিনি তরুণদের আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক শক্তিতে বলীয়ান করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।’

উপদেষ্টা অধ্যক্ষ পবিত্র মোহন দাশ বলেন, ‘নারেন্দ্রনাথ দত্ত শ্রী রামকৃষ্ণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে স্বামী বিবেকানন্দ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। মানুষের দুঃখ-কষ্ট প্রত্যক্ষ করে অনাহার-স্বল্পাহারের সঙ্গে তিনি ভারতবর্ষ পায়ে হেঁটে ঘুরেছেন।’

সাংবাদিক শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন জানান, ‘স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন এমন একজন যুগপুরুষ, যিনি যুবসমাজকে ঘুম থেকে জাগিয়ে আত্মমর্যাদা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর ‘ওঠো, জাগো’ আহ্বান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।’

অধ্যক্ষ নির্মল কুমার দাশ যোগ করেন, ‘তরুণদের শারীরিক ও মানসিক শক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেছিলেন—নিজেকে গঠন করো এবং অন্যকে গঠনে সহায়তা করো। এ দর্শনেই একটি শক্তিশালী সমাজ গড়ে ওঠে।’

শ্রীমতি স্নিগ্ধা নাথ বলেন, ‘ঈশ্বরপ্রেম, দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের সমন্বয়েই স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন পূর্ণতা পেয়েছে। তিনি ধর্মের নামে বিভেদ নয়, ভালোবাসার সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।’

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিত্যানন্দ সরকার উল্লেখ করেন, ‘স্বামী বিবেকানন্দ কেবল ধর্মগুরু নন, তিনি মানবমুক্তির দিশারি। রাজনীতি, সমাজ ও মানবসেবার সবকিছুরই নৈতিক ভিত্তি তাঁর দর্শনে প্রতিফলিত হয়েছে।’

বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বরূপ চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘স্বামীজীর আদর্শ শুধু আলোচনা সভায় সীমাবদ্ধ নয়। শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্নসেবা ও মানবকল্যাণমূলক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আমরা তাঁর মানবপ্রেম বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।’

আলোচনা সভার পর শতাধিক শীতার্ত ও অসহায় মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করে মানবসেবামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। প্রদীপের শিখা নিভে গেলেও স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ ও সহায়তার বার্তা জীবন্ত থেকে যায়।

দিনশেষে আয়োজকরা সবাইকে অনুপ্রাণিত করেন—‘ওঠো, জাগো, মানবতার পাশে দাঁড়াও।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত