দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় নির্দিষ্ট মানের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা বাতিলের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে পোশাক শিল্পের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে ও গভীর সংকটের সৃষ্টি হবে বলে জানিয়েছে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। এর প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে সংগঠন দুটি। অন্যদিকে সুতা আমদানিতে বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশের সুতার বাজার দখলে নিয়েছে প্রতিবেশী দেশ। ফলে স্থানীয় কারখানা বন্ধ হচ্ছে এবং শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন টেক্সটাইল শিল্প খাতের শ্রমিক নেতারা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, দেশীয় সুতা কারখানা বন্ধ হলে ভবিষ্যতে নিট পোশাক খাত পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে। এতে পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে, লিড টাইম (গ্রাহকের অর্ডার দেওয়া থেকে পণ্য বা পরিষেবা সরবরাহ করা পর্যন্ত সময়) বাড়বে, মূল্য সংযোজন হ্রাস পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে বন্ড সুবিধা থাকবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার এনবিআরের।
জানা গেছে, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) গত ১৭ সেপ্টেম্বর ও ২৯ ডিসেম্বরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও-২ শাখা এনবিআর ১০ ও ৩০ কাউন্টের সুতায় বন্ড সুবিধা বাতিলের জন্য নির্দেশ দিয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে বস্ত্র ও পোশাক খাত থেকে, যার ৫৫ শতাংশই নিট পোশাকের অবদান। রপ্তানি খাত উৎসাহিত করতে সরকার আশির দশক থেকে এ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করে আসছে। নিট গার্মেন্টসের কাঁচামাল হিসেবে সুতা বন্ড সুবিধায় আমদানি হয়ে থাকে। তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তারা এ খাতে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বিনয়োগের মাধ্যমে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক স্থানীয় কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, নিট পোশাক উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল হলো ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা, যা বাংলাদেশে মূলত ভারত থেকে আমদানি করা হয়। বিটিএমএর দাবি, দেশে এক কেজি সুতা উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় ৩ ডলার, অথচ ভারত একই মানের সুতা উৎপাদন করছে ২ দশমিক ৮৫ থেকে ২ দশমিক ৯০ ডলারে এবং বাংলাদেশে রপ্তানি করছে প্রায় ২ দশমিক ৫ ডলারে। অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি করে সুতার উৎপাদন মূল্য কমিয়েও ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগী দেশগুলোর প্রণোদনাপ্রাপ্ত মূল্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। ফলে এ খাতে দেশীয় উদ্যোক্তারা অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন এবং তাদের বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়ছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত দুই অর্থবছরে বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, ফলে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত সুতার বিক্রি কমে গেছে। বর্তমানে দেশীয় সুতা কারখানাগুলো তাদের উৎপাদনক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছে। আর্থিক ক্ষতির কারণে ইতিমধ্যে ৫০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আরও কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা। উদ্যোক্তাদের দাবি, দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কটন সুতা ও ব্লেন্ডেড ইয়ার্ন সরবরাহে দেশের সামগ্রিক চাহিদা পূরণে সক্ষম।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মনে করে, বন্ড সুবিধা অব্যাহত থাকলে দেশীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং উৎপাদন ব্যয় ও লিড টাইম বেড়ে যাওয়ার কারণে রপ্তানি খাতের সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পাবে। বিপরীতে নিম্ন কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে দেশীয় স্পিনিং শিল্পে ভারসাম্য ফিরে আসবে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হবে।
দেশে সুতা ব্যবসার জন্য বিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ শহরের টানবাজার এলাকা। এই এলাকায় দুই দশক ধরে কাজ করা খাপসা খানম (৪৮) বলেন, ‘এই এলাকায় দেড়শ ফ্যাক্টরি ছিল। এখন ২০টাও নেই। ফলে কাজও নেই। আগে অনেক ওভারটাইম করতাম। এখন ওভারটাইম দূরের কথা, কাজই পাই না।’
মুজিব এন্টারপ্রাইজের কর্মকর্তা জয়দেব চন্দ্র সাহা বলেন, বন্ড সুবিধা কাজে লাগিয়ে ভারত কম দামে সুতা দেশে রপ্তানি করছে। ফলে আমরা অস্তিত্বের সংকটের মুখে পড়ছি। আমাদের কাজও অনেক কমে গেছে।’ এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ায় দেশের সুতার বাজারে বড় প্রভাব পড়েছে বলেও মনে করেন জয়দেব। তিনি বলেন, সুতার ব্যবসা গার্মেন্টসের ওপর নির্ভরশীল। ৫ আগস্টের পরবর্তী অনেক গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ছোট অনেক পোশাক কারখানা এই এলাকায় থেকে সুতা নিয়ে ব্যবসা করতেন। এদের অধিকাংশ হয় বন্ধ হয়ে গেছে, না হয় ব্যবসা গুটিয়ে ফেলছেন। নির্বাচনের পর ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক হলে বন্ধ কারখানাগুলো চালুর পর সুতা ব্যবসার এ মন্দা কিছুটা কাটিয়ে উঠবে বলে মনে করেন তিনি।
সার্বিক বিষয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে হাজার কোটি টাকার সুতার মজুদ পড়ে থাকে আর সরকার ভারত থেকে পোশাক শিল্পের সুতা আনার সুযোগ করে দেয়। মুখে মুখে ভারতবিরোধিতা করব কিন্তু দেশের শিল্প ও শ্রমিকদের রক্ষার জন্য উদ্যোগ নেব না, এটা রাষ্ট্রের দ্বিচারী চরিত্র।
তিনি আরও বলেন, ভারত সুতা শিল্প টিকিয়ে রাখতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করেছে, প্রণোদনা দিয়েছে, প্রযুক্তি আধুনিকায়নে সহজ শর্তে ঋণ দেয়। মিলগুলোকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা দেয়। প্রযুক্তি আধুনিকায়নে তহবিল পায়। কিন্তু ভারতীয় সুতার হাত থেকে এ দেশের স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো রক্ষা করা ও লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন-জীবিকা রক্ষা করতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। উল্টো স্থানীয় সুতা উৎপাদনে নগদ প্রণোদনা ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করা হলো।
এদিকে সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের প্রতিবাদে আজ সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে সংশ্লিষ্ট খাতের গুরুত্বপূর্ণ দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। সংগঠন দুটি মনে করে, সরকারের এ সিদ্ধান্ত পোশাক শিল্পের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে ও গভীর সংকটের সৃষ্টি হবে। তাদের মতে, স্থানীয় টেক্সটাইল মিল মালিকদের পরামর্শ অনুসারে আমদানি করা সুতার ওপর শুল্ক আরোপ করা হলে, তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
