বিশ্ব মন্দা, ভূ-রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প যখন কোণঠাসা, সেই সময়ে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপে সরকারের সিদ্ধান্তকে চরম ‘বিপর্যয়কর’ ও ‘আত্মঘাতী’ বলে দাবি করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। গতকাল সোমবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ-এর যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে এ দাবি করা হয়।
জানা গেছে, দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় নির্দিষ্ট মানের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) গত ১৭ সেপ্টেম্বর ও ২৯ ডিসেম্বরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও-২ শাখা এনবিআর ১০ ও ৩০ কাউন্টের সুতায় বন্ড সুবিধা বাতিলের জন্য নির্দেশ দিয়েছে। সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে পোশাকশিল্পের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে ও গভীর সংকটের সৃষ্টি হবে বলে জানিয়েছে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। এর প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে সংগঠন দুটি।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিজিএমইএ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান। এ সময় বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ও নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বিজিএমইএ সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান, সহ-সভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, সহ-সভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান, সহ-সভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী, পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রহিম, ফয়সাল সামাদ, মোহাম্মদ আবদুস সালাম, সুমাইয়া ইসলাম, কাজী মিজানুর রহমান, মোহাম্মদ সোহেল, সাবেক সহ-সভাপতি শহিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপকে একতরফা উল্লেখ করে সিদ্ধান্ত বাতিলের জোর দাবি জানয়েছেন তারা।
এ সিদ্ধান্ত পোশাকশিল্পের জন্য চরম ‘বিপর্যয়কর’ ও ‘আত্মঘাতী’ আখ্যায়িত করে সেলিম রহমান বলেন, ‘বিশ্ববাজারের মন্দা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের এই ক্রান্তিকালে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ করার অর্থ হলো দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে জেনেশুনে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া।’
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী আমদানিতে শুল্কারোপের আগে স্থানীয় শিল্পে ক্ষতির প্রমাণ দিতে হয়, যা এক্ষেত্রে মানা হয়নি এবং এটি সরাসরি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সেফগার্ড চুক্তির লঙ্ঘন। পোশাক রপ্তানিকারকরা জানান, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রতি কেজি সুতায় প্রায় ৪০ সেন্ট বা ৪৬ টাকা বেশি দাম দাবি করছে, যা রপ্তানি সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
নিট পোশাক খাত থেকে বছরে ২৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় আসে, যা এখন এই সিদ্ধান্তের কারণে ঝুঁকির মুখে। দেশীয় মিলগুলো উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত সুতা সময়মতো সরবরাহ করতে না পারায় আমদানির পথ রুদ্ধ হলে উৎপাদন সিডিউল তছনছ হয়ে যাবে। পোশাক খাতের নেতারা স্পষ্ট জানান, তারা দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার বিরোধী নন, তবে সেই সুরক্ষা আমদানিতে বাধা দিয়ে নয় বরং সরাসরি নগদ সহায়তা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এবং স্বল্প সুদে ঋণের মাধ্যমে দেওয়া উচিত।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, ‘পোশাক খাত এখন আইসিইউ’তে আছে। পাটের পর এখন পোশাকশিল্প ধ্বংস হবে। স্পিনিং ভালো একটি খাত। কিন্তু তাদের সুরক্ষা দিতে গিয়ে অন্যদের ক্ষতি করলে তো হবে না। শুধু সুতা আমদানি বন্ধ করে স্থানীয় শিল্প রক্ষার কথা বলেন, কিন্তু শিল্পের প্রয়োজনীয় জ¦ালানি সরবরাহের কোনো খবর নেই। প্রতিবেশী ভারতের কথা বলা হচ্ছে। তারা নিজেদের সুরক্ষায় নগদ সহায়তা থেকে শুরু করে শিল্পের প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। আর আমরা দিনকে দিন সহায়তা কমিয়ে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।
অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, যারা শিল্প গড়েছেন তাদেরকেই ঠিক করতে হবে কীভাবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে। অন্যের ওপর ভর করে সব সময় টিকে থাকা সম্ভব নয়। তৈরি পোশাকশিল্পের অন্যান্য খাতেও বন্ড সুবিধা রয়েছে, তারা তো প্রতিযোগতায় টিকে আছে। রপ্তানিতে অবদান রাখছে। অথচ আমাদের টেক্সটাইল খাত নিজেদের সুবিধার কথা ভাবছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের অংশগ্রহণ বা প্রতিযোগিতায় থাকার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশে^ প্রতিনিয়তই পোশাকে নতুনত্ব আসছে। সেখানে একই মানের সুতা দিয়ে পোশাক তৈরি করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কতটা সম্ভব?
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ অর্থাৎ ৮২ শতাংশই আসে গার্মেন্টস খাত থেকে, যার মধ্যে এককভাবে ৫৫ শতাংশ অবদান রাখছে নিট পোশাক খাত অর্থাৎ ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় আসে এই খাতটি থেকেই। শুধু তাই নয়, নিট পোশাক খাত লাখো লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।
আশির দশক থেকে এই খাতের যে ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি, তার মূল ভিত্তিই হলো বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। একই সময়ে সুতা আমদানিতে ওজনে প্রায় ৯৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। বাজার অর্থনীতির অতি সাধারণ নিয়ম হলো, রপ্তানি বাড়লে তার প্রধান কাঁচামাল আমদানিও আনুপাতিক হারে বাড়বে। আর যেখান থেকে কম দামে কাঁচামাল পাওয়া যাওয়া যাবে, সেখানেই ক্রেতা যাবে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাশর্^বর্তী একটি দেশে প্রতি কেজি সুতার আমদানি মূল্য ৪২৮ দমমিক ৩৭ টাকা
থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৩৮৯ দশমিক ১৮ টাকা হয়েছে। অথচ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক নিট শিল্পের সক্ষমতা ও চাহিদা অগ্রাহ্য করে, বাজার অর্থনীতি অগ্রাহ্য করে সুতা আমদানির এই স্বাভাবিক চিত্রকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে, যা অনভিপ্রেত। এতে করে নিট পোশাক খাতের ২৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে, যা শিল্পের জন্য মোটেও শুভ নয়, দেশের সমগ্র অর্থনীতির জন্য একটি অশনীসংকেত।
বিজিএমইএ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, আমরা দেখছি, একটি বিশেষ খাতের পদ্ধতিগত অদক্ষতাকে আড়াল করতে গিয়ে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোয় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত পড়ে থাকার যে খতিয়ান দেওয়া হচ্ছে, তার কারণ অনুসন্ধানে খুব বেশি গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। উত্তরটা বাজার অর্থনীতির অতি সাধারণ নিয়মেই নিহিত। আন্তর্জাতিক বাজারে যেখানে ‘৩০ কার্ডেড’ এক কেজি সুতার দর ২ দমমিক ৫০ থেকে ২ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার, সেখানে আমাদের দেশীয় মিলগুলো একই সুতা সরবরাহ করতে চাচ্ছে ৩ ডলারে। অর্থাৎ, প্রতি কেজিতে ব্যবধান প্রায় ৪০ সেন্ট বা ৪৬ টাকারও বেশি। বিশ্ববাজারের তীব্র প্রতিযোগিতায়, যেখানে মাত্র এক-আধ সেন্টের হেরফেরে আমরা অর্ডার হাতছাড়া করি, সেখানে কাঁচামালের পেছনে কেজিতে ৪০ সেন্ট বাড়তি খরচ করা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়, এককথায় জেনেশুনে আত্মহননের পথে পা বাড়ানো।
