জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ও ধারাবাহিক পররাষ্ট্রনীতির জন্য রাজনৈতিক ঐক্য ও জনগণের সমর্থনের গুরুত্ব আলোচিত সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) ‘বৈদেশিক নীতি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক সম্পর্ক’ শীর্ষক একটি নীতি সংলাপের আয়োজন করে।
সংলাপটি মঙ্গলবার, (২৭ জানুয়ারি) রাজধানী ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। সংলাপে নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির বর্তমান বাস্তবতা, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও অংশীদারিত্বের প্রভাব, এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে একটি কার্যকর ও জনমুখী কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করা হয়।
অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ এর সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, আমেনা মহসিন; সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী; সাবেক পররাষ্ট্র সচিব, মহসিন আলী খান; বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী; বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স; সাবেক সংসদ সদস্য ও জনতা পার্টি বাংলাদেশ-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান গোলাম সারোয়ার মিলন; খেলাফত মজলিসের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল; সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসান; গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত চৌধুরী; সাংবাদিক সোহরাব হাসান; বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস; সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী; এবি পার্টির সহকারী সদস্যসচিব ও উইমেন উইংয়ের কো-অর্ডিনেটর, ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি; এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন প্রমুখ।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সভাপতি জিল্লুর রহমান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন হলেও বৈদেশিক নীতি নিয়ে আলাদা কোনো কমিশন হয়নি এবং এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগও দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ইতিহাসের অন্যতম জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকলেও এর স্থায়ী সমাধানে বা আন্তর্জাতিক পরিসরে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরতে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারেও পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি।
আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা একটি মাল্টি-পোলার কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে সব প্রধান শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হবে। তিনি বলেন, এর সঙ্গে সরাসরি বিনিয়োগের বিষয়টি জড়িত। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য উপযুক্ত ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যা একই সঙ্গে দেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে শক্তিশালী করতেও সহায়ক হবে। তিনি আরও বলেন, কূটনৈতিক দরকষাকষি বা নেগোসিয়েশনের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, পাকিস্তান চীন থেকে অস্ত্র ক্রয় করলেও যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ বা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েনি, যা তাদের দক্ষ কূটনীতিরই ফল। পাশাপাশি তিনি মত দেন, সরকার যদি জনভিত্তির ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে যে কোনো সরকারই কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে শক্ত ও কার্যকর অবস্থান নিতে সক্ষম হবে।
আমেনা মহসিন বলেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতে যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে রাজনীতিকীকরণ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে একটি সংকট তৈরি হয়েছে এবং ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতাও একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব সংকট মোকাবিলায় পরবর্তী সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
আতাউর রহমান ঢালী বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতায় রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে কূটনীতির গুরুত্ব বেড়েছে এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, তিন দিক থেকে ভারতের সীমান্তঘেরা অবস্থান, অভিন্ন নদী ও পরিবেশগত নির্ভরতা এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তিনি সীমান্ত বিরোধ, অবৈধ বাণিজ্য ও অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেন।
পাশাপাশি তিনি বলেন, ভারতের পর বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীনের গুরুত্ব বেড়েছে, বিশেষ করে অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর ও সমুদ্রভিত্তিক যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগের কারণে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের রপ্তানির সিংহভাগ এসব বাজারনির্ভর।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, তার দলসহ বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো ইতিমধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে, যেখানে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, ইশতেহারের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা এবং জনগণ ও দেশের স্বার্থনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন। পাশাপাশি উন্নয়নশীল ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংহতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি বলেন, সরকার যাদের সঙ্গে বন্ধু তাদের সঙ্গে কথা বলে, যাদের সঙ্গে বন্ধু নয় তাদের সঙ্গে নয়, যা বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বলেন, পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে বিএসসি ফরেন ক্যাডাররা কাজ করবে। এছাড়া তিনি বলেন, এলডিসি গ্রাজুয়েশন ঘনিয়ে আসলেও বাংলাদেশ প্রস্তুত নয় এবং অর্থনৈতিক অবস্থার অস্বচ্ছতা মধ্যবিত্তের প্রদর্শনের সঙ্গে বৈপরীত্যপূর্ণ।
সামান্তা শারমিন বলেন, বাংলাদেশের জন্য তিনটি দিক পররাষ্ট্র নীতির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। তা হল বিআরআই, এলডিসি, ইন্দো-প্যাসিফিক। আমাদের দেশের আভ্যন্তরীণ নীতি ঠিক না থাকলে বহির্বিশ্বের সাথে পররাষ্ট্র নীতি থাকবে না। আমাদের পাওয়ার অভার মরালিটি কাজ করে।
মহসিন আলী খান বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নয়, এটি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের অন্য অংশের কাজ। সহযোগী হিসেবে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কাজ করতে পারে, তবে এ দায়িত্ব অন্যদের। কাজেই, এ মন্ত্রনালয়কে অর্থ পাচারের জন্য দায়ী করা ঠিক নয়।
কামরুল আহসান বলেন, শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে হলে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই জনগণের মধ্যে দৃঢ় জনভিত্তি তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন, যে দেশের জনগণ বা জনভিত্তি দুর্বল, সেই দেশের ওপর অন্য রাষ্ট্র সহজেই নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে।
গোলাম সারোয়ার মিলন বলেন, দেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, এটি জাতীয় নীতি হওয়া উচিত যা সরকারের পরিবর্তনেও অপরিবর্তিত থাকে। তিনি বলেন, এর জন্য একটি জাতীয় পররাষ্ট্রনীতির দলিল প্রণয়ন জরুরি। এছাড়া তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যর্থতা ও গোপন চুক্তি করার অভিযোগ তুলে নিন্দা জানান।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল বলেন, ডিসেম্বর মাসে পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ও তথ্যভিত্তিকভাবে সমাধান করা জরুরি। একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গা সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এর স্থায়ী সমাধানের জন্য ধারাবাহিক ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য।
সুব্রত চৌধুরী বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ক্ষমতায় এসে পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক উন্নয়নের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি বলেন, ঘোষিত অগ্রগতির পরিবর্তে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য দেখা যায়নি। বরং প্রধান উপদেষ্টা অতিমাত্রায় বিদেশ সফর করেছেন, যা সংখ্যার দিক থেকে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনিকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নীতির দিকনির্দেশনা পরিবর্তিত হয়, যা একটি বড় সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মূল সমস্যার জায়গা কোথায় সেটি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, পানি কূটনীতি ও আন্তঃসীমান্ত নদী ইস্যু বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে পরবর্তী সরকারকে আরও দায়িত্বশীল ও সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।
ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি; বরং দুই প্রধান দলই প্রায় একই ধরনের পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করেছে। তিনি বলেন, পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের দায়িত্ব নির্বাচিত সাংসদ ও প্রতিনিধিদের হলেও বাস্তবে আমলাদের মধ্যে এক ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যার কারণে তাদের প্রণীত নীতির বাইরে যাওয়া সম্ভব হয় না।
সোহরাব হাসান বলেন, কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলার জন্য জাতীয় ঐকমত্য জরুরি, কিন্তু বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি বিভাজিত অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, দেশে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকায় স্বাধীন ও বাস্তবভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন কঠিন।
ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন বলেন, শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির অভাবে এখনও রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, এর জন্য সরকারের সঙ্গে জনগণের সুসম্পর্ক জরুরি এবং আশা প্রকাশ করেন, আগামী নির্বাচিত সরকার জনগণবান্ধব ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করবে।
