বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক জিএম হায়দার সাজ্জাদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রাণীর অভিযোগ তুলে নিজেই শাস্তির কবলে পড়েছেন দেশসেরা রাইফেল শুটার কামরুন নাহার কলি। জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকাবস্থায় সাজ্জাদের ব্যাভিচারী আচরণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন কলি। তাতেই ফেডারেশন কর্তাদের চক্ষুশূল হয়ে যান তিনি। কোড অব কন্ডাক্ট ভঙ্গের অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে ফেডারেশন। পাশাপাশি তার ক্লাব বাংলাদেশ নেভির কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে তিন দিন সময় বেধে দেওয়া হয়। নেভি শুটিং ক্লাব ব্যাখ্যা দিয়েছে অনেকদিন হলো। অথচ ফেডারেশন কলির শাস্তির প্রত্যাহারের কোন উদ্যোগই নেয়নি। উল্টো ফেডারেশনের মহাসচিব আলেয়া ফেরদৌসী তার প্রসঙ্গে যা বলেছেন, তাতে বেশ বোঝা যাচ্ছে সহসাই শাস্তি উঠছে না কলির।
গতবছর সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশের ছয় ক্রীড়াবিদকে স্কলারশিপ দিচ্ছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক সংস্থা। এর মধ্যে তিনজন শুটার ও তিনজন আরচার। সেই বৃত্তি পেয়ে আরচাররা ঠিকই নিজেদের প্রস্তুত করছেন ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিক গেমসের জন্য। তবে উল্টো রথে শুটাররা। অজ্ঞাত কারণে প্রায় কুড়ি দিন বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি শুরু হয়েছে ক্যাম্প। তাতে তিন বৃত্তিপ্রাপ্তর মধ্যে যোগ দিয়েছেন কেবল রবিউল ইসলাম। সাময়িক বরখাস্ত থাকায় কলি যোগ দেননি। আর অভিযুক্ত সাজ্জাদের কুপ্রস্তাবে পাওয়ার পর শুটিং কমপ্লেক্সে নিজেকে নিরাপদ মনে না করায় ক্যাম্পেই যোগ দেননি শায়রা আরেফিন। এমনকি চার মাস পর পর মূল্যায়ন পত্রেও স্বাক্ষর করেননি তিনি। ফলে যে কোন সময় অলিম্পিক বাতিল হয়ে যেতে পারে কলি ও শায়রার।
ফেডারেশন তার ব্যাপারে কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে কলি বলেন, 'তারা (ফেডারেশন) আমাকে বহিষ্কার করেছে কোড অফ কন্ডাক্ট ভাঙার অভিযোগে। আমি আসলে কোড অফ কন্ডাক্ট ভাঙতে বাধ্য হয়েছিলাম। কোড অফ কন্ডাক্ট মানেই নীরবতা চুক্তি নয় যে চার দেয়ালের মাঝখানে তিনি বা তারা (ফেডারেশন কর্তারা) যা চাইবেন, যা ইচ্ছা করবেন আমাদের তা সহ্য করতে হবে। আমি যাকে নিয়ে অভিযোগ করেছি সে তো অতিযুক্ত প্রমাণিত হয়েছে তদন্তের মাধ্যমে। সে তো অভিযুক্ত। তাহলে আমার বহিষ্কারাদেশ কেন এখনো প্রত্যাহার করা হচ্ছে না?'
দীর্ঘ সময় রেঞ্জের বাইরে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই পারফরম্যান্স খারাপ হচ্ছে কলির। অথচ শাস্তির আগ পর্যন্ত জাতীয় দলের ক্যাম্পে তিনিই ধারাবাহিকভাবে অন্য সবার চেয়ে ভালো করছিলেন। তাকে নিয়ে জাতীয় দলের কোচ শারমিন আক্তারের মূল্যায়নেই তার প্রমাণ মেলে। তবে শারমিন তার শৃঙ্ক্ষলা নিয়েও মূল্যায়নপত্রে প্রশ্ন তুলেছেন। কলি বলেন, 'যেহেতু আমার পারফরম্যান্স ভালো এবং এবছর অনেকগুলো গেমস আছে এমনকি এশিয়ান গেমসের মতো বড় আসর আছে, দেশের স্বার্থে হলেও আমার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা উচিত। কারণ আমার বহিস্কারের ব্যাপারে আমার সংস্থা বাংলাদেশ নৌ বাহিনী তাদের ব্যাখ্যাও ফেডারেশনকে জানিয়েছে। আসলে তাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি বলেই আজ আমাকে শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে।'
ফেডারেশনের অশীতিপর মহাসচিব আলেয়া ফেরদৌসী দাবী করেন কলি নিজের কারণেই শাস্তি ভোগ করছে। আর তার ব্যাপারে এককভাবে তার কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার নেই, নির্বাহী কমিটির সভাতে হবে সিদ্ধান্ত, 'কলির বিষয়ে (ক্লাবের ব্যাখ্যা) আমাদের ইসিতে প্লেস করতে হবে, ইসি যা সিদ্ধান্ত দেবে তাই হবে। আমরা কি ইচ্ছে করে তাকে বাইরে রেখেছি? আমাদের তো ওর সঙ্গে কোন শত্রুতা নেই।এটা দেশের জন্য কেন, সবকিছুর জন্যই ক্ষতি হচ্ছে। ওর নিজের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, ফেডারেশনেরও ক্ষতি হচ্ছে। আমরা কি বুঝি না এটা? আমরা তো বুঝি। আমরা বুঝি বলেই ওকে একটা ডিসিপ্লিনের মধ্যে রাখতে চেয়েছি। ও যদি ডিসিপ্লিন না মানে আমাদের তো কিছু করার নেই।' আলেয়া দাবী করেন বিতর্কিত সাজ্জাদের বিরুদ্ধে কথা বলায় কলিকে শাস্তি দেয়নি ফেডারেশন। বরং কলি নাকী ফেডারেশনের সবার বিরুদ্ধে মিথ্যে ও বানোয়াট অভিযোগ করেছেন, 'আপনারা কেন ওই বিষয়টি এর সঙ্গে মেলাচ্ছেন? সাধারণত আপনি যদি কোন অন্যায় করেন, আপনার প্রতিষ্ঠান আপনাকে বোঝাবে না? বোঝাবে। তো সেই বোঝানো বা কাউন্সিলিং যদি আপনি না মানেন এবং কাউন্সিলিং যদি আপনার কাছে খারাপ লাগে আপনি অডাসিটি দেখান। তারপর বাইরে বলে বেড়ান যে এই হয়েছে, ওনারা আমাকে টর্চার করেছে, নানান কথা বলেছে। এ জন্যই আমাদের একটা ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নিতে হয়েছে।'
এদিকে কলির শাস্তি প্রত্যাহার অনুরোধ নিয়ে আলেয়ার কাছে গিয়ে সম্প্রতি হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে দুই আন্তর্জাতিক পদকজয়ী সাবেক শুটার সাবরিনা সুলতানা ও শারমিন আক্তার রত্নাকে। মহাসচিবের কাছে অনুরোধ জানাতে সম্প্রতিক তারা গিয়েছিলেন ফেডারেশনে। তবে মহাসচিব তাদের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান এবং ফেডারেশনে অন্য সদস্যদের দিয়ে হেনস্তা করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করেন সাবেক শুটাররা। সাবরিনা বলেন, 'দেশকে একাধিক স্বর্ণপদক এনে দেওয়া একজন সাবেক শুটার হিসেবে আমার শুটিং ফেডারেশনে যাওয়া ও মহাসচিবের সঙ্গে দেখা করার অধিকার আছে। সে অধিকার থেকেই কলির শাস্তি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানাতে কমপ্লেক্সে যাই। অথচ মহাসচিব আলেয়া ফেরদৌসী আমাদের সঙ্গে দেখাই করতে চাননি। আমি এবং রত্না সাবেক তারকা। তিনি পারতেন আলাদা করে ডেকে তার কক্ষে নিয়ে কথা বলতে। অথচ তিনি মুখ ফিরিয়ে রেখেছেন। শুটিং ফেডারেশনের মহাসচিব যদি শুটারদেরকেই সম্মান দিতে না জানেন তবে তার কাছ থেকে ভালো কিছু কী আশা করা যায়?'
শারমিন আক্তার রত্না বলেন, 'আমরা শুটিং ফেডারেশনে আলেয়া ফেরদৌসীর কাছে গিয়েছিলাম কলিকে কেন বহিষ্কার করা হয়েছে এবং কলির বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করবে কিনা জানার জন্য। অথচ তিনি আমাদের সঙ্গে কথাই বলতে চাননি। তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছেন আমরা কে যে তার কাছে কলির বিষয়ে কথা বলতে এসেছি? এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা যে আমরা আমাদের অনূজদের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের বিষয়ে শুটিংয়ের অভিভাবকের কাছে কোন কথা বলার এখতিয়ার রাখি না।'
এদিকে দুই শুটার অনুশীলনের মধ্যে না থাকায় চিন্তার ভাঁজ পড়েছে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কর্তাদের কপালে। বিওএ'র মহাসচিব যোবায়দুর রহমান রানা অতিশিঘঘরই বিষয়টি নিয়ে শুটারদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানা গেছে।
