শেরপুর-৩ আসনে জামায়াত-বিএনপির সংঘর্ষের ঘটনায় বেশ কয়েকটি প্রশ্ন তুলে বিএনপি বলেছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। জামায়াতের দাবি, পুরো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের ব্যর্থতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন না করলে ঘটনাপ্রবাহ এতদূর গড়াত না। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকার বলেছে, ‘সহিংসতার ফলে প্রাণহানি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং অত্যন্ত দুঃখজনক।’
ঘটনার পর থেকে শেরপুরে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। উত্তেজনা কমলেও আতঙ্ক কমছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দুই উপজেলার মোড়ে মোড়ে পুলিশ এবং চার প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ঝিনাইগাতীর ইউএনও এবং ওসিকে প্রত্যাহার করার কথা জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। গতকাল তিনি বলেন, প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পর।
গত বুধবার শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এতে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হন। আহত হন উভয় দলের শতাধিক নেতাকর্মী।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে রেজাউল করিমের মরদেহ আনা হয়। এরপর শ্রীবরদী সরকারি কলেজে তার প্রথম জানাজা হয়। রাতে দ্বিতীয় জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে রাতে তার মৃত্যুর খবরে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল করেন জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি।
সরকারের উদ্বেগ : গতকাল অন্তর্বর্তী সরকারের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। জেলার সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণহানির কোনো স্থান নেই।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সব রাজনৈতিক দল, নেতা এবং নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত সবার প্রতি শান্তি বজায় রাখা, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং শান্তিপূর্ণ ও গঠনমূলক উপায়ে ভোটারদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সরকার।
জানতে চাইলে শেরপুর জেলা প্রশাসক মাহমুদুর রহমান বলেন, বিএনপি এবং জামায়াতের দুই প্রার্থীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তারাও শান্ত পরিবেশ বজায় রাখতে চান এবং আগামী দুদিন নির্বাচনী প্রচারণা না করার জন্য আহ্বান করা হয়েছে।
কয়েকটি প্রশ্ন বিএনপির : রাজধানীর গুলশানে বিএনপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, ‘শেরপুরে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
তিনি বলেন, ‘এ সংঘাত এড়ানো যেত কি না, নির্ধারিত সময়ের আগে একটি দল কেন সব চেয়ার দখল করে রাখল? সেই দলের লোক কেন সেখানে লাঠিসোঁটা জড়ো করল? সবার সম্মিলিত অনুরোধ উপেক্ষা করে সেই দলের প্রার্থী কেন সংঘাতের পথ বেছে নিলেন, এসব বিষয় নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।’
মাহদী আমিন বলেন, ‘শেরপুরে স্থানীয় প্রশাসনের আয়োজনে সব প্রার্থীর অংশগ্রহণে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে প্রত্যেকটি দলের বসার জন্য আসন নির্ধারিত ছিল। জামায়াতে ইসলামীর নেতারা সব আসন তথা চেয়ার দখল করে রেখেছিলেন এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের তাদের নির্ধারিত আসনে বসতে দিচ্ছিলেন না। প্রশাসন বারবার আহ্বান জানানোর পরেও তারা চেয়ার ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। চেয়ারে বসার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শেরপুরে যে সহিংসতা ও সংঘাত আমরা দেখেছি, সেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। গণঅভ্যুত্থানের পর সবার প্রত্যাশা ছিল এমন একটি নির্বাচন, যেখানে পরিবেশ হবে উৎসবমুখর, সংঘাতময় নয়।’
তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কিছু ভিডিও দেখেছি, যেখানে দেখা যাচ্ছে, জামায়াতের প্রার্থীকে বারবার পুলিশ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সেনাবাহিনী এমনকি বিএনপির নেতাকর্মীরাও হাতজোড় করে অনুরোধ করেছিলেন যেন তিনি ওই রাস্তা দিয়ে না যান। তারপরও তিনি কেন সেদিক দিয়েই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন? তাকে বারবার বলতে শোনা যাচ্ছিল, ‘জান যায় যাক’।”
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ করছি। পাশাপাশি সব মহল থেকে আহ্বান জানাতে চাই, কেউ যেন কোনো উসকানি না দেন, কোনো উসকানিতে পা না দেন এবং সবাই মিলে একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সৌহার্দ্যপূর্ণ নির্বাচনী প্রচারণা নিশ্চিত করি। শেরপুরের এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন দেশের আর কোথাও না ঘটে, সেজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি। প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক আচরণ বজায় রাখতে হবে, এটিই গণমানুষের প্রত্যাশা।’
প্রশাসনের ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে : গতকাল রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, ‘পুরো ঘটনাপ্রবাহে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রথম মারামারির সময় পুলিশ সহযোগিতা করলে ঘটনাপ্রবাহ এত দূর আসত না। সেটা না করে পুলিশ-প্রশাসন নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করে। সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে এসে সংঘর্ষ থামানোর চেষ্টা করে। এজন্য আমরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এ সময় সেনাবাহিনীর একজন সদস্য আহত হওয়ায় আমরা তার প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি ও তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। অবিলম্বে হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা এবং ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের ব্যর্থতা তদন্তপূর্বক তাদের বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
জামায়াতের এ সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আরও বলেন, ‘আপনারা জানেন, গত কয়েক দিনে সারা দেশে জামায়াত ও ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীদের প্রচারণায় বাধা দেওয়া হয়েছে। অব্যাহতভাবে জামায়াতের নারী কর্মীদের ওপর হামলা ও নিপীড়ন করা হয়েছে। প্রশাসনকে বারবার জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আমরা প্রশাসনের এই একপক্ষীয় আচরণের প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন শেষে অ্যাডভোকেট জুবায়ের বলেন, ‘বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলের উসকানি ও সরাসরি নির্দেশে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে আমরা মনে করি। সেখানে বিএনপির সন্ত্রাসীরা আগে থেকেই জামায়াত ও ১১-দলীয় প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলকে হত্যার উদ্দেশ্যে অবস্থান করছিল।’
‘কর্তব্যরত ইউএনও এবং পুলিশ-প্রশাসন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে নীরবতা পালন করেছে’ এমন অভিযোগ করে জামায়াতের এ নেতা বলেন, ‘এতে প্রমাণিত হয় প্রশাসন একদিকে হেলে পড়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে কিছু থাকবে না এবং নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে এখনই সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে বিএনপির সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, এলডিপির সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নূরে আলম ও যুববিষয়ক সম্পাদক আমান সুবহান, খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক আবদুল আজিজ খসরু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) প্রকাশনাবিষয়ক সম্পাদক এইচ এম জিয়াউল আনোয়ার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে শেরপুরে জামায়াত নেতা হত্যার প্রতিবাদ এবং দেশব্যাপী নারী কর্মীদের ওপর সহিংসতার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে দলটির ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ শাখা। গতকাল জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে শুরু হয়ে বিক্ষোভ মিছিলটি পল্টন, বিজয়নগর, কাকরাইল হয়ে শান্তিনগরে গিয়ে শেষ হয়। এর আগে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে প্রতিবাদ সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতোই বিএনপি হত্যার পথ বেছে নিয়েছে। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জবাব জনগণ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালটের মাধ্যমে দেবে। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগকে যেভাবে বিদায় নিতে হয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারি এ দেশ থেকে সন্ত্রাসীদের বিদায় নিতে হবে।’
