কলম্বোতে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপ ম্যাচে ভারতের মুখোমুখি না হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান। পাকিস্তান সরকারের ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া ওই ঘোষণার পর বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আইসিসি জানায়, তারা চায় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) এমন একটি সমাধানের পথ খুঁজুক, যা সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করবে। একই সঙ্গে আইসিসি সতর্ক করে বলেছে, ম্যাচ বর্জনের সিদ্ধান্তের প্রভাব পাকিস্তান ও বৈশ্বিক ক্রিকেট ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর হতে পারে।
ইএসপিএনক্রিকিনফো আইন বিশেষজ্ঞদের কথা বলে জেনেছে, আইসিসির ইভেন্টে অংশগ্রহণের জন্য প্রতিটি সদস্য বোর্ডকে ‘মেম্বারস পার্টিসিপেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এমপিএ) নামে একটি চুক্তিতে সই করতে হয়। ওই চুক্তির একটি ধারায় স্পষ্ট বলা আছে—যে কোনো দল যোগ্যতা অর্জন করলে টুর্নামেন্টের সব নির্ধারিত ম্যাচে নিঃশর্তভাবে অংশ নিতে হবে।
এই কারণে পাকিস্তান যদি ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলে, আইসিসি সহজেই বলতে পারে যে পিসিবি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
‘ফোর্স মেজর’ দেখিয়ে কি দায় এড়াতে পারবে পিসিবি?
পিসিবি সম্ভাব্যভাবে ‘ফোর্স মেজর’ বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঘটে যাওয়া পরিস্থিতির যুক্তি তুলে ধরতে পারে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ, সন্ত্রাসী হামলার পাশাপাশি সরকারের সরাসরি নির্দেশকেও ফোর্স মেজর হিসেবে ধরা হয়।
পিসিবির দাবি হতে পারে—সরকারি নির্দেশের কারণেই তারা ভারতের বিপক্ষে খেলতে পারছে না। তবে এ ক্ষেত্রে পিসিবিকে আইসিসিকে লিখিতভাবে জানাতে হবে, সরকারের কোন নির্দেশের ভিত্তিতে তারা ম্যাচ খেলতে অক্ষম এবং সেই নির্দেশ কীভাবে চুক্তির শর্ত পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে।
একটি ম্যাচ না খেললে পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই বাদ পড়তে পারে?
এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় আইনি বিতর্ক।
আইসিসি চাইলে যুক্তি দেখাতে পারে—একটি ম্যাচ খেলতে না পারলে দলটি পুরো টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের শর্তই পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে পিসিবির অংশগ্রহণের অধিকার বাতিলও করা হতে পারে।
অন্যদিকে পিসিবির যুক্তি হতে পারে, এটি ‘আংশিক ফোর্স মেজর’। অর্থাৎ শুধু একটি ম্যাচে তারা বাধাগ্রস্ত হয়েছে, পুরো টুর্নামেন্টে নয়। তাদের দাবি অনুযায়ী, সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত ম্যাচটি পরিত্যক্ত হিসেবে ধরা এবং পয়েন্ট ও নেট রান রেটে ক্ষতি হওয়া—এর বাইরে বাড়তি শাস্তি নয়।
পিসিবি চেয়ারম্যান ও সরকারের সম্পর্ক কি মামলাকে দুর্বল করবে?
এই বিতর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—পিসিবির চেয়ারম্যান মহসিন নকভি একই সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আইনে জাতীয় বোর্ডগুলোকে সরকার থেকে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা বলা হয়।
আইসিসি চাইলে যুক্তি দিতে পারে, বোর্ড ও সরকার কার্যত একই নিয়ন্ত্রণে থাকলে ফোর্স মেজর পরিস্থিতিটি ‘স্ব-সৃষ্ট’ (self-created) হতে পারে, যা আইনি প্রতিরক্ষা হিসেবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া চুক্তিতে ফোর্স মেজরের ক্ষতি কমানোর (mitigation) বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। আইসিসি প্রশ্ন তুলতে পারে—পিসিবি কি এই সংকট এড়াতে বা সমাধানে যথেষ্ট উদ্যোগ নিয়েছিল?
নকআউটে ভারতের বিপক্ষে খেললে কী অবস্থান দুর্বল হবে?
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করবে পাকিস্তান সরকার যে নির্দেশের কথা বলছে, তার ভাষার ওপর। আপাতত যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেখানে নির্দিষ্টভাবে ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচের কথাই উল্লেখ আছে।
কিন্তু একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচ না খেলে পরে নকআউট ম্যাচ খেললে, পিসিবির ফোর্স মেজর যুক্তি আরও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
পিসিবির ওপর কী ধরনের শাস্তি আসতে পারে?
পিসিবির অবস্থান অনুযায়ী, এটি ফোর্স মেজরের ঘটনা হলে ম্যাচটি পরিত্যক্ত হিসেবে গণ্য করা ছাড়া আর কোনো শাস্তি প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়।
আর যদি চুক্তি ভঙ্গ হিসেবে দেখা হয়, তবে ক্ষতিপূরণ ও আর্থিক জরিমানার বিষয় আসতে পারে।
তবে আইসিসি চাইলে বিষয়টি আরও কঠোরভাবে বিবেচনা করতে পারে। আইসিসির সংবিধানে গুরুতর দায়িত্ব লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোনো সদস্য বোর্ডের সদস্যপদ স্থগিত বা বাতিল করার ক্ষমতাও রয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি হবে অত্যন্ত চরম পদক্ষেপ।
অতীতের বয়কটের উদাহরণ কি কাজে আসবে?
২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড–জিম্বাবুয়ে বা নিউজিল্যান্ড–কেনিয়া ম্যাচ না খেলার ঘটনা কিংবা ২০০৯ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভিসা জটিলতায় জিম্বাবুয়ের না খেলার নজির নৈতিকভাবে আলোচনায় আসতে পারে। তবে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সেগুলোর তেমন শক্ত প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
