জনবল, অর্থ কিছুই নেই মিজানের একাই ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম

ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের মেঘনা পাড়ের জেলে পল্লীতে দেখা যায় ব্যতিক্রমী এক দৃশ্য। প্রার্থী নিজে একা একাই লিফলেট বিতরণ করছেন। ভোট চাইছেন পল্লীর ঘর থেকে নদীর তীরের নৌকায় গিয়ে। নির্বাচনী প্রচারণা, ভোট চাওয়া মানেই দলেবলে হৈ হুল্লুর হলেও, এই প্রার্থীর বেলায় তেমনটি দেখা যায়নি। জনবল ধন কিছুই নেই মিজানের। একাই ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে।

ব্যতিক্রমী প্রার্থী কবি মিজানুর রহমান এনপিপির আম প্রতীক নিয়ে ভোলা-১ (সদর) আসন থেকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন করছেন। এ আসনের ৮ জন প্রার্থীর মধ্যে তিনি সবচেয়ে কম আয়ের প্রার্থী। যার নির্বাচনী খরচ মাত্র ৩০ হাজার টাকা। তাই দল বল নেওয়ার সামর্থ না থাকায় ভোটারদের সমর্থন আদায়ে একা নিজেই ছুটছেন এভাবে। নিজেই নিজের লিফলেট তুলে দিচ্ছেন ভোটারদের হাতে। কুশল বিনিময় করছেন আর ভোটাদেরকে বলছেন নিজের অভিব্যক্তি, প্রতিশ্রুতি, আশ্বাস আর বিশ্বাস।

উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের ভোলা মাছ ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তার নির্বাচনি প্রচারণা কার্যক্রম। এক জেলে-নৌকা থেকে আরেক নৌকায় বিতরন করছেন লিফলেট। নদীর তীর থেকে পল্লীর ঘরগুলোতে নারী -পুরুষের কাছে বলে যাচ্ছেন তার প্রতিশ্রুতি।

কবি মিজান প্রতিশ্রতিতে বলেন, আপনারা উপজেলা নির্বাচনে আমাকে ভাইস চেয়ারম্যান পদে ভোট দিয়েছেন। আমার পিঠের চামড়া দিয়ে যদি জুতো বানিয়ে দিই, তা-ও শেষ হবেনা। জেলেদের ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারবো না। এবার আমি আপনাদের কাছে এসেছি এমপি পদপ্রার্থী হিসেবে ভোট চাইতে। আমি অত্যন্ত গরিব ও অসহায় মানুষ। দীর্ঘদিন নৌবাহিনীর চাকরি করেছি। দেখেন আমার কোনো কর্মী নাই। একজন কর্মী থাকলে দৈনিক ৩০০/৪০০ টাকা করে দেওয়া লাগে। আমি নিজেই চলতে বড় সমস্যা। জীবনে আপনারা কতজনেরে এমপি মন্ত্রি বানাইছেন। এইবার আমাকে একটি আম মার্কায় ভোট দিবেন। আমি একজন সাধারণ পরিবারের সন্তান। জেলের সন্তান। আমি এমপি হওয়া মানে হলো আপনারাই এমপি হবেন। আমাকে যদি একবার এমপি হওয়ার সুযোগ করে দেন, তাহলে ভোলাতে অনেক ভূমি রয়েছে। প্রচুর গ্যাস আছে। সেখানে আপনারা যারা গৃহহীন রয়েছেন, তাদেরকে গৃহের ব্যবস্থা করে দিব। মায়ের কোলের সন্তান যেনো মায়ের কোলেই থাকেন। ভোলার কোনো সন্তান যেনো ঢাকায় যেতে না হয়। সেজন্য শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠিত করার ব্যবস্থা করবো। এলাকাতে কোনো চাঁদাবাজ সন্ত্রাস থাকবেনা। আমার শরীরে কাদার গন্ধ মিশে আছে। আমি আপনাদের মতো কাদার মানুষের সাথে মিশে থাকবো সব সময়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের যখন কোটি কোটি টাকা ও সম্পদের ছড়াছড়ি তখন ব্যতিক্রম এই প্রার্থীর বার্ষিক আয় মাত্র ১০ হাজার টাকা। সহায়-সম্পদ বলতে আছে পিতার জমিতে ৩০ হাজার টাকার একটি কাঁচা ঘর। যা তার মাথা গোজাবার একমাত্র সম্বল। রাজনৈতিক দলের দুর্নীতি, অনিয়ম ও জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ও হাজার বছরের নির্যাতিত-নিষ্পেশিত মানুষের হয়ে কথা বলতে জাতীয় সংসদে যেতে চান মিজান। নির্বাচনের ব্যয় করছেন মাত্র ৩০ হাজার টাকা দিয়ে। যা বন্ধু স্বজনদের সহায়তায় পাওয়া। ২০২৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সদর উপজেলা থেকে ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পাওয়া ২৬ হাজার ভোটারের সমর্থন থেকেই তিনি সংসদ নির্বাচন করার অনুপ্রেরণা পান।

কবি মো. মিজানুর রহমান দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোলা-১ আসন থেকে সতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী তোফায়েল আহমেদ। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করা ভোটারদের স্বাক্ষরের গড়মিলের কারণে বাতিল হয় মিজানের মনোনয়ন। সেই নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কারণে এবার তিনি এনপিপির (ন্যাশনাল পিপলস পার্টি) প্রার্থী হিসেবে ‘আম প্রতীকে’ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করা হলফনামা ও আয়কর বিববরণীতে দেখা যায়, টিউশনি থেকে তার বার্ষিক আয় মাত্র ১০ হাজার টাকা। নিজের নেই কোন জমি জমা। বাবার ৩ শতাংশ জমিতে একটি কাঁচা ঘর তুলে বসবাস করেন। যার দাম উল্লেখ করা হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। বিবরণীর বাকী সবগুলো ঘরই ফাঁকা। দিতে হয় না কোন আয়কর। ভোলা জেলার চারটি আসনে বৈধ ২৯ জন প্রার্থীর মধ্যে সবচেয়ে কম আয় তার। নির্বাচনী ব্যয় উল্লেখ করেছেন মাত্র ৩০ হাজার টাকা। নেই কোন ফৌজদারী মামলাও।

সদর উপজেলার ভেদুরিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম চরকালী গ্রামের পল্লী চিকিৎসব শাহ আলমের ছেলে মিজানুর রহমান। ১৯৮৮ সালে জন্ম নেওয়া মিজান ২০০৫ সালে এসএসসি পাস করেন। দেশ প্রেমের স্বপ্ন নিয়ে ২০০৭ সালে নাবিক হিসেবে যোগদেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে। কঠোর নিয়মনীতির মধ্যে ভালো কাটছিল না সাহিত্য প্রেমি কবি মিজানের জীবন। ২০১৯ সালে স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অব্যহতি নিয়ে ফিরে আসেন নিজ গ্রামে। কবিতা লেখার পাশাপাশি গ্রামের শিশুদের প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেন। চাকরি থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালে ঢাকার এক তরুণীকে বিয়ে করেছিলেন। অভাব আর টানা পড়েনের সংসার ভালো না লাগায় ২০১৯ সালে মিজানকে ছেড়ে তার স্ত্রী অন্যের সঙ্গে সংসার বাঁধেন।

মিজানুর রহমান জানান, প্রার্থী হওয়ার কারণে গেল ডিসেম্বর মাসে ভোলার অগ্রণী ব্যাংকে একটি হিসাব খুলেছেন তিনি। নির্বাচনে টিআইএনের বাধ্যবাধকতার কারণে আয়কর বিবরণী জমা দিয়েছেন। টাকা ও  পেশীশক্তির বিরুদ্ধে এ লড়াইকে ‘দুর্গম যাত্রা’ বলে অবহিত করেছেন মিজান। তিনি বলেন মাফিয়ার যুগে টাকা ছাড়া জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া যায় না। অর্থ- পেশিশক্তি ব্যবহার করে যারা নির্বাচতি হন পরবর্তীতে তারা মানুষের কথা বলেন না। নিঃস্বার্থভাবে মানুষের পাশে থাকেন না। তিনি সেসব বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি হতে চান। প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি না দিয়ে, নির্বাচিত হতে পারলে জনগণকে সাথে নিয়ে তাদের সমস্যার সমাধান করবেন। কোন পোস্টার ব্যানার করেন নাই। নিজের ১০ হাজার ও বন্ধু-স্বজনদের সহায়তার ৩০ হাজার টাকা দিয়ে লিফলেট করেছেন। ওই লিফলেট নিয়েই তিনি যাচ্ছেন ভোটারদের কাছে। তার প্রচার-প্রচারণায় থাকছে না কোন বহর।

বিগত দিনের নির্বাচন নিয়েও মিজানুর রহমানের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোলা-১ (সদর) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। মিজানের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা তোফায়েল আহমেদ প্রভাব খাটিয়ে তৎকালীন জেলা প্রশাসককে দিয়ে তার মনোনয়পত্র বাতিল করেছেন। তাকে নানা ভাবে হয়রানিও করা হয়েছে।

পরবর্তীতে তিনি ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন। একা একাই গেছেন ভোটারদের কাছে। দরিদ্র ভোটারদের উন্নয়নে সমর্থন চেয়েছেন। সে নির্বাচনে তিনি ২৬ হাজার ৩১৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী প্রভাব খাটিয়ে বিজয়ী হন। মিজানের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের মধ্যে তিনি প্রায় ২৬ হাজার ভোটারের সমর্থন পেয়েছেন। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই এবার সংসদ সদস্য প্রার্থী হয়েছেন। কোন মিছিল, স্লোগান প্রচারণার বহর ছাড়াই মিজান যাচ্ছেন প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের কাছে। স্বপ্ন তার অনেক আশা বঞ্চিদের সেবা করার।

২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামায় দেখা যায়, নির্ভরশীলদের নামে ৫০ হাজার টাকার বাড়ি দেখিয়েছেন। সেখানেও আর কোন সম্পত্তির কথা উল্লেখ ছিল না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত