গণভোটে চার প্রশ্নে ‘হ্যাঁ-না’র মুখোমুখি হবেন ভোটার

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম

আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। আলাদা দুটি ব্যালটে ভোটগ্রহণ চলবে। সাদা-কালো ব্যালটে হবে জাতীয় সংসদের ভোট, গোলাপি ব্যালটে হবে গণভোট। রঙিন ব্যালটে চারটি প্রশ্ন থাকলেও একটি ভোট দিয়ে উত্তর দিতে হবে-‘হ্যাঁ’ বা ‘না’।

এই চার প্রশ্নের পেছনে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘জুলাই সনদের’ ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব। বিএনপি-জামায়াতসহ কতিপয় দল এই সংশোধনীতে নীতিগত সমর্থন জানিয়েছে।

গণভোটের ব্যালটে একটি মাত্র প্রশ্ন থাকবে: ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’ এর নিচে চারটি পৃথক উপপ্রশ্ন বা ধারা উল্লেখ করা হবে।

এই চারটি ধারা হলো- ক. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গঠনে জুলাই সনদের প্রক্রিয়া অনুসরণ, খ. দু’কক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন ও উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, গ. নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমাসহ ৩০টি ঐকমত্যপূর্ণ প্রস্তাব বাস্তবায়নে নির্বাচিত দলের বাধ্যবাধকতা এবং ঘ. সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি।

এখানেই তৈরী হচ্ছে বিভ্রান্তি! ভোটারকে চারটি আলাদা বিষয়ের ওপর একই সঙ্গে একটিমাত্র ‌‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে বলা হচ্ছে। কারো যদি একটি বা দুটি ধারায় সমর্থন এবং বাকিগুলোতে আপত্তি থাকে, তার পক্ষে কীভাবে একক উত্তর দেওয়া সম্ভব? এই পদ্ধতি বিশ্বের কোথাও প্রচলিত নেই। 

গণভোটের ব্যালট প্রশ্ন নিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন মহলে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছাড়া বেশিরভাগ দল ও বিশিষ্টজন এই গণভোট পদ্ধতির সরাসরি বিরোধিতা করছেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ আইনজীবী শাহদীন মালিক সরকারের এই গণভোটকে ‘সংবিধান বহির্ভূত’ বলছেন। তার মতে, দুনিয়ার সব দেশের রেওয়াজ-কোন প্রস্তাব আগে সংসদে পাস হবে, পরে জনগণের সম্মতির জন্য গণভোট হতে পারে। আগে গণভোট, পরে সংসদ-এটি সংসদ ও সংবিধানের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী।

শাহদীন মালিক আরও যোগ করেন, বলা হচ্ছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে ১৮০ দিনের মধ্যে সংসদকে সংস্কার প্রস্তাবগুলি গ্রহণ করতেই হবে। না হলে ‘আপনা-আপনি’ এটা সংসদে পাস হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে। আইনে এ রকম ধরে নেওয়া যায় না। সংসদকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করলে সংসদ আর সার্বভৌম থাকে না।

মালিকের মতে, আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এই প্রস্তাবিত ৪৮টি সংবিধান-সংস্কারের ধারা বর্তমান সংবিধানের পরিপন্থী। এটা নিঃসন্দেহে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ দূরে থাকুক, বিশিষ্ট জনেরাও এই ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে অন্ধকারে। ইউনূস সরকার ৮৪টির মধ্যে ৪৮টি জটিল সংস্কার প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ প্রশ্ন রেখেছেন। অথচ সাধারণ মানুষ জানেনই না সেই প্রস্তাবে কী আছে।

ইউনূস প্রণীত ‘জুলাই সনদের’ ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সাংবিধানিক সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং বাকি ৩৬টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনকালীন শাসনব্যবস্থা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো পরিবর্তন, ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর বাধ্যতামূলক ৩০ দফা অঙ্গীকার এবং নতুন একটি উচ্চ কক্ষ গঠনের মতো বড় ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী আসিফ সালেহ প্রশ্ন তুলেছেন, জুলাই সনদের ৮৪ ধরনের বিষয় জনগণের কাছে কি আদৌ স্পষ্ট? তার মতে, পরিবর্তনের একমাত্র শর্ত হিসেবে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে তুলে ধরে জনগণের মধ্যে মিথ্যা আশা তৈরি করা হচ্ছে।

শুরু থেকেই সরকার সরাসরি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে নেমেছে। দাবি করা হচ্ছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে স্বৈরাচার চিরতরে বিদায় নেবে। সম্প্রতি সরকারপ্রধান ইউনূস টিভি-রেডিওয় প্রচারিত বার্তায় বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে দেশ বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে। প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে খুলবে সেই দরজা?

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি হয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরে। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে এবং সেই সভায় বিরোধী দলনেতা বা উপনেতাকেও উপস্থিত থাকতে হবে। পরিবর্তন আসবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন।

এতদিন বাংলাদেশের নাগরিকরা বাঙালি জাতি হিসেবে পরিচিত হলেও সংস্কার প্রস্তাব পাস হলে বাঙালির পরিচয় হবে বাংলাদেশি। বর্তমানে সংবিধানের মূলনীতি হলো-বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে তা হবে-সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি।

আইনজীবী শাহদীন মালিক একটি বিষয় সামনে তুলে ধরে বলেছেন, গণভোটের বাক্সে ব্যালট যদি কম পড়ে, তাহলে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদের ওপর গণভোট মানার নৈতিক চাপটা অনেক কমে যাবে। এ ছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতির আদেশটি কোর্টে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। কারণ জুলাই সনদের অনেক প্রস্তাবই অসাংবিধানিক। আমরা সাংবিধানিক জটিলতা থেকে বেরোতে চাইছি, কিন্তু যে ভাবে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তাতে সাংবিধানিক জটিলতা আরও বাড়বে।

এমন জটিল ও বহুমাত্রিক প্রশ্নের সামনে দেশের ভোটাররা কেমন করে শুধুমাত্র একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ এর মাধ্যমে তাদের মতামতের সঠিক প্রতিফলন ঘটাবেন, তা এখন বড় এক অনুক্ত প্রশ্ন!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত