আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠিত হবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে অভূতপূর্ব এক গণভোট। একই ব্যালটে নির্বাচনী প্রতীকের পাশাপাশি ভোটাররা চারটি বিষয়ে সমষ্টিগত ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন। কিন্তু গণভোটের বিষয়বস্তু ও ফলাফলের প্রভাব নিয়ে ভোটারদের মধ্যে সংশয় রয়ে গেছে।
গণভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন একসঙ্গে সেট আকারে রাখা হয়েছে। ভোটারদের এ সেটের পক্ষে বা বিপক্ষে একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিতে হবে। প্রশ্ন চারটি হলো-
১. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদের আলোকে গঠন করা।
২. আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে দলীয় ভোটের অনুপাতে।
৩. নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ ৩০টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
৪. জুলাই সনদের অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা।
‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে কী ঘটবে?
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ টানা দুই মেয়াদ বা ১০ বছর পর্যন্ত সীমিত থাকবে। জাতীয় সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষ গঠিত হবে ১০০ সদস্য নিয়ে, যা নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে নির্ধারিত হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সাংবিধানিক স্বীকৃতি ফিরে পাবে। সংরক্ষিত নারী আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করা হবে। বাধ্যতামূলকভাবে ডেপুটি স্পিকার হবেন বিরোধী দল থেকে। সংসদ সদস্যরা বাজেট ও আস্থা বিল ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে। তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিজ ক্ষমতায় নিয়োগ দিতে পারবেন। রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনে উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে।
বিচার বিভাগ পাবে পূর্ণ স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা। প্রত্যেক বিভাগে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন করা হবে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারকদের মধ্য থেকে। নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত হবে।
প্রধান উপদেষ্টা সম্প্রতি জানিয়েছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। পরিষদ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করবে। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে।
‘না’ জয়ী হলে কী ঘটবে?
গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে জুলাই সনদের কোনো সংস্কারই বাস্তবায়িত হবে না। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে না এবং সংবিধান সংস্কারের কোনো প্রক্রিয়া শুরু হবে না।
জাতীয় সংসদ বর্তমান কাঠামোয় বহাল থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা থাকছে না। সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো বিষয়ে স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ পাবেন না। সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়বে না।
রাষ্ট্রপতি প্রাণভিক্ষা মওকুফসহ বর্তমান ক্ষমতাগুলো আগের মতোই প্রয়োগ করতে পারবেন। অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষিত কোনো সংস্কার বাস্তবায়নের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকবে না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান কাঠামো বহাল থাকবে।
রাজনৈতিক সদিচ্ছাই মূল চাবিকাঠি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, এর প্রকৃত মূল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার ওপর। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব। গণভোটে জনগণের সম্মতির মধ্য দিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে এই স্বচ্ছতা নিশ্চিতের পথ সুগম হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ সাংবিধানিক কাঠামোর জন্যই দেশের শাসকগোষ্ঠী ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার সুযোগ পায়। আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে জয়ী করে এই ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার পথ বন্ধ করতে হবে।’
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমবে, সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা বাড়বে এবং সব পর্যায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। তবে সেই পথ কতটা সুগম হবে, তা নির্ভর করবে আগামীকালের ভোটারদের রায় ও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি পালনের ওপর।
