২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর তেহরান-ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। ইরানে সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভের সময় থেকে নতুন করে শুরু হওয়া উত্তেজনা ক্রমশ ডালপালা মেলছে। মূলত মুদ্রার মানের রেকর্ড পতন ও ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে ক্ষোভ থেকেই ইরানের মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। আবার ইরানের এই শোচনীয় অর্থনৈতিক সংকটে পেছনে মুখ্য ভূমিকা আছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেরই। ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্ববাণিজ্যে পশ্চাৎপদ হয়ে আছে ইরান। জীবনযাত্রার মান কমার পাশাপাশি ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ইরানিরা। দেশটির রপ্তানিকৃত তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করে চীন। এই রপ্তানি কোনোভাবে যদি হ্রাস পায় তবে তেল বিক্রি থেকে আয় কমে যাবে ইরানের। যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে এবার চীনকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারেন ট্রাম্প। গত বুধবার হোয়াইট হাউজে সপ্তমবারের মতো নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন ট্রাম্প। ওই বৈঠকে- চীনে ইরানের তেল রপ্তানি হ্রাস করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাজ করা উচিত বলে একমত হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
অ্যাক্সিওস বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়েছে যেখানে তিনি বলেছেন, আমরা একমত হয়েছি যে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করতে পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করব, উদাহরণ হিসেবে, চীনে ইরানের তেল বিক্রি-সংক্রান্ত। যদিও গতকাল রবিবার রয়টার্স জানায়, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। এটি দেশটির নতুন চান্দ্রবর্ষ উপলক্ষে শুরু হওয়া জাতীয় ছুটির প্রথম দিন। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান চুক্তি করতে রাজি না হলে দেশটিতে হামলার হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এই লক্ষ্যে ইরানের আশপাশের জলসীমায় নৌবহর মোতায়েন করেছেন তিনি। আর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ‘কয়েক সপ্তাহব্যাপী দীর্ঘ অভিযানের’ প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন দুই কর্মকর্তা। তবে উত্তেজনা প্রশমনে একটি চুক্তির চেষ্টায় ওমানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি কূটনীতিকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। এ আলোচনার মাধ্যমে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো গেলে আপাতত ইরান হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এড়াতে পারবে।
এদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইরানের সার্বভৌমত্ব, বৈধ স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ইসলামি বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানকে পাঠানো এক বার্তায় পুতিন তাকে অভিনন্দন জানান। বার্তায় পুতিন বলেন, রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ ও সুপ্রতিবেশীসুলভ। বর্তমান জটিল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ইরান যে তার সার্বভৌম অধিকার ও বৈধ স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে, রাশিয়া তার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখবে। তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন, মস্কো ও তেহরানের মধ্যে সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব ভবিষ্যতেও আরও শক্তিশালী হবে। পুতিন ইরানের প্রেসিডেন্টের সুস্বাস্থ্য ও সাফল্য কামনা করেন এবং দেশটির জনগণের শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রত্যাশা করেন।
নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত : রেজা পাহলভি
ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহর নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভি বলেন, তিনি দেশটিতে একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ’ গড়ে তোলার জন্য নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত আছেন। ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন হওয়াটাই ‘সবচেয়ে ভালো উপায়’ বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর গতকাল শনিবার জার্মানির মিউনিখে এক সমাবেশে এ কথা বলেন তিনি। ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে দেশটির সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল সুইজারল্যান্ড বলেছে, আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওমান সরকার আগামী সপ্তাহে জেনেভায় নতুন দফা বৈঠকের আয়োজন করবে। আর এর মধ্যেই রেজা পাহলভি ইরানে নেতৃত্ব দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেন।
রেজা পাহলভি ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরান ছেড়েছিলেন। তারপর আর দেশে ফেরেননি। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। গতকাল মিউনিখে প্রায় দুই লাখ সমর্থকের সামনে বক্তব্য দেন রেজা পাহলভি। তিনি বলেন, একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতে পাড়ি দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে আমি এখানে এসেছি। রেজা পাহলভি আরও বলেন, আপনাদের জন্য রূপান্তরের নেতা হিসেবে ভূমিকা রাখতে আমি অঙ্গীকারাবদ্ধ, যেন একদিন আমরা ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশের ভাগ্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করার সুযোগ পাই। রেজা পাহলভি দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা ইরানি নাগরিকদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
