ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে ‘উপেক্ষা’ করে আরবের দিকে ঝুঁকছে ইরান?

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫০ এএম

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকাকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। জার্মানির মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনকে ‘সার্কাস’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় শক্তিগুলো এখন পঙ্গু ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।

এ বছর জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত বার্ষিক এই নিরাপত্তা সম্মেলনে ইরানি কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এর প্রতিক্রিয়ায় গত রবিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) আরাঘচি লেখেন, ‘ইরান ইস্যুতে অত্যন্ত গুরুত্ববহ মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনকে ‘মিউনিখ সার্কাসে’ পরিণত হতে দেখাটা দুঃখজনক।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চলমান আলোচনার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ই৩ (ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানি)-এর পঙ্গুত্ব ও অপ্রাসঙ্গিকতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এক সময় যারা প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিল, সেই ইউরোপকে এখন কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বরং আমাদের আঞ্চলিক বন্ধুরা (উপসাগরীয় দেশসমূহ) এখন রিক্তহস্ত ও প্রান্তিক ই৩-এর চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ও সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।’

২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে বিশ্বশক্তির ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং জার্মানি—এই তিন দেশ (ই৩) প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন এই চুক্তি থেকে বের হয়ে গিয়ে ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে পুরো প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে। এরপরও ই৩ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করেছিল।

তবে গত বছর থেকে পুনরায় আলোচনা শুরু হওয়ার পর ওমান এবং কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোই এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন দফার আলোচনার উদ্দেশ্যে একটি কূটনৈতিক ও কারিগরি প্রতিনিধি দল নিয়ে জেনেভা যাওয়ার প্রাক্কালে আরাঘচি এই মন্তব্য করেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, গত সপ্তাহে ওমানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত পরোক্ষ আলোচনার ধারাবাহিকতায় জেনেভায় এই বৈঠক হতে যাচ্ছে।

সফরকালে আরাঘচি সুইজারল্যান্ড ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টারের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আব্বাস আসলানি বলেন, ‘আরাঘচির এই মন্তব্য ইরানের নীতি পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়। তারা এখন মনে করছে সমস্যা সমাধানের জন্য ই৩ মেকানিজম আর কার্যকর কোনো পথ নয়। কূটনীতির মূল কেন্দ্র এখন ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে সরে এসেছে।’

আগামীকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) জেনেভায় ওমানের আয়োজনে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে গত ৬ ফেব্রুয়ারি মাস্কাটে অনুষ্ঠিত পরোক্ষ আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার অংশ নিয়েছিলেন। গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং ইরানের পরমাণু স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণের পর এই প্রক্রিয়াটি থমকে গিয়েছিল।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার পরিবর্তনের হুঁশিয়ারির মধ্যে এই আলোচনা শুরু হচ্ছে। তবে দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড়। ইরান পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নমনীয়তা দেখালেও যুক্তরাষ্ট্র ব্যালেস্টিক মিসাইল এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি ইরানের সমর্থনের বিষয়টিও আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, যা তেহরানের কাছে ‘অলোচনা অযোগ্য’।

সূত্র: আল-জাজিরা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত