রাজনীতি যদি সত্যিই কোনো অর্থ বহন করে, তবে একসময় তাকে সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। নির্বাচনী সেøাগান খুব দ্রুত শাসনের কঠিন বাস্তবতায় উবে যায়। গণরায়ের ম্যান্ডেট কোনো ট্রফি নয়; এটি এক গভীর দায়বদ্ধতা। আর রাজনৈতিক পুনরুত্থানের পর ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জন্য সেই দায় সহজ নয়, বরং ভারী ও জটিল। তারেক রহমান এমন এক সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন জনগণের প্রত্যাশা শুধু উচ্চ নয়, তারা অস্থির ও অধীর। দেশ একসময় রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনীতিতে টালমাটাল অবস্থা এবং সামাজিক বিভাজনের দীর্ঘ সময় অতিক্রম করেছে। এখন সরকারকে লক্ষ্য করা হবে কথার জোরে নয়, স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার সক্ষমতার ভিত্তিতে। ক্ষমতার প্রথম দিন থেকে যে চ্যালেঞ্জগুলো বিএনপি সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে, সেগুলো অনিবার্য ও জরুরি। বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে, বাজারই নিয়ন্ত্রণ করবে সরকারকে। বাংলাদেশে টানা কয়েকটি সরকার নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে অনীহা কিংবা অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। চাল, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, চিনি এসব প্রয়োজনীয় পণ্য যেন জল্পনা-কল্পনার মূল বিষয় হয়ে উঠেছে। রমজানের আগে মূল্যবৃদ্ধি এখন মৌসুমি ওঠানামা নয়; এটি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শোষণে রূপ নিয়েছে। এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক ন, এটি নৈতিকও। যখন নিত্যপণ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন প্রকৃত মূল্য দেয় দিনমজুর, রিকশাচালক, গার্মেন্টসকর্মী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার আঘাত নীরবে সহ্য করে এই শ্রেণিই। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্তাব্যক্তিরাই কখনো চোখ বুঁজে থেকেছে, কখনো বা বাজার কারসাজির সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছে। এই চক্র ভাঙতে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে অভিযানের নাটক যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, সরবরাহব্যবস্থার ডিজিটাল নজরদারি, প্রতিযোগিতা আইন কার্যকর প্রয়োগ এবং বাজার তদারকি সংস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
স্বচ্ছ আমদানি নীতি, বাফার স্টক ব্যবস্থাপনা ও তাৎক্ষণিক তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়াশীল নয়, প্রতিরোধমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এখানে ব্যর্থ হলে, বিএনপি সরকার শুরুতেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে পারে। মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনীতির সূচক নয়; এটি রাজনৈতিক বিস্ফোরক। আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার ও মব সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। যে রাষ্ট্রে জনতা আইন হাতে তুলে নেয়, সেখানে শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। বিগত সময়ে গণপিটুনি, হঠাৎ মিছিল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, দলীয় কোন্দল এসব যেন স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে উঠেছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কখনো দ্বিধাগ্রস্ত, কখনো রাজনৈতিক প্রভাবাধীন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ফলাফল, পেশিশক্তি বিচার প্রক্রিয়াকে ছাড়িয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের করণীয় স্পষ্ট, কিন্তু তা হতে হবে আইনানুগ ও পেশাদার। প্রথমত, পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাগত স্বাধীনতা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংঘবদ্ধ সহিংসতার ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, দলীয় পরিচয় অপরাধের ঢাল হতে পারবে না। বাংলাদেশ অতীতেও নানাবিধ অস্থিতিশীল সময় দেখেছে; ভবিষ্যতেও দেখতে পারে। তবে আইনশৃঙ্খলা যদি বাছ-বিচারহীন ও দৃশ্যমান না হয়, তাহলে নাগরিকের নিরাপত্তাবোধ ভেঙে পড়বে। তখন সরকারের ওপর কেবল অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়, নিরাপত্তাহীনতার দায়ভারও বর্তাবে।
গত দেড় বছরে কার্যকর জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য দুর্বল হয়েছে। মূলধন পাচার বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন প্রভাবশালীদের একটি অংশ ও তাদের কুশীলবরা বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, মুদ্রার অবমূল্যায়ন সব মিলিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। অর্থনীতি তাৎক্ষণিক জোড়াতালি দিয়ে টেকে না। নতুন সরকারকে তিন দিক থেকে অগ্রসর হতে হবে : প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং বৈধ বিনিয়োগ আকর্ষণ। দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সন্দেহজনক মূলধন স্থানান্তর অডিট করা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে অবৈধ অর্থ অনুসন্ধান জরুরি। একই সঙ্গে রাজস্ব সংস্কার, ভর্তুকির যৌক্তিকীকরণ এবং রপ্তানি বৈচিত্র্য এসব এখন আর বিলাসিতা নয়, টিকে থাকার শর্ত। বাণিজ্য, জ¦ালানি সহযোগিতা, নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক কূটনৈতিক সংলাপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভারতেরও উচিত ‘বড় ভাই’ মানসিকতা পরিহার করা। ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের ছায়া অংশীদারত্বকে দুর্বল করে। আয়তনের বৈষম্য থাকলেও, মর্যাদায় সমতা থাকতে হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তববাদী ও সার্বভৌম। শিক্ষার্থীদের দাবি তোলার অধিকার আছে, তবে তা সহিংসতায় পরিণত হওয়া উচিত নয়। সরকারের দায়িত্ব দ্বিমুখী : শিক্ষাব্যবস্থা স্বাভাবিক করা এবং ভবিষ্যতের আশা পুনর্গঠন করা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিত চালু রাখা, বৃত্তি বাড়ানো, কর্মসংস্থানের বাস্তব পথ দেখানো এবং অতীতের ছাত্ররাজনীতির নামে অপরাজনীতির পুনরাবৃত্তি রোধ করা অপরিহার্য। নির্বাচনী সাফল্য সুযোগ এনে দেয়, নিশ্চয়তা নয়। মূল্যস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কূটনৈতিক ভারসাম্য, তরুণদের পুনর্নির্দেশ এসব প্রান্তিক ইস্যু নয়; রাষ্ট্রের ভিত্তি।
তারেক রহমান ও তার সহকর্মীরা দ্রুত উপলব্ধি করবেন সরকার পরিচালনা রাজনীতির চেয়ে কম নাটকীয়, কিন্তু বেশি কঠিন। এতে ধৈর্য, প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন দরকার। কখনো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তও নিতে হয়। বাজার সিন্ডিকেট, অপরাধচক্র, দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থলিপ্সু গোষ্ঠী এরা সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। নেতৃত্বের পরীক্ষা কিন্তু সেখানেই। বাংলাদেশ অতীতে অনেক ঝড় সামলে পুনরায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অধ্যায় পুনর্জাগরণের, নাকি পশ্চাদপসরণের হবে তা নির্ভর করবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাস্তবায়নের ওপর। ক্ষমতা সাময়িক, দায়িত্ব তাৎক্ষণিক আর ইতিহাস বড় নির্মম। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করি, তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা এবং দল দেশকে নতুন বার্তা দেবে। রাজনীতিতে তিনি যেন প্রমাণ করতে পারেন ‘নীতির রাজা’ই রাজনীতি।
লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক