রমজান মাস আগমনের সঙ্গে সঙ্গে একজন মুমিনের হৃদয়ে আনন্দ, প্রশান্তি ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য অনুভূতি জেগে ওঠে। রমজান শুধু একটি মাস নয়, এটি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এক মহাসুযোগ। এ মাসে আল্লাহতায়ালা বান্দার প্রতি বিশেষ দয়া বর্ষণ করেন, পাপ মোচনের দরজা খুলে দেন এবং জান্নাত লাভের পথ সুগম করে দেন। তাই যুগে যুগে ইমানদাররা অধীর আগ্রহে এই মাসের অপেক্ষা করে এবং আগমনে বলে ওঠে, আহলান সাহলান মাহে রামাজান।
রমজানের মর্যাদা ও তাৎপর্য অপরিসীম। কোরআনে এই মাসের বিশেষত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ মাসেই মানবজাতির হেদায়াতের জন্য কোরআন নাজিল হয়েছে, যা সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী এবং জীবনব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা। কোরআনের সঙ্গে রমজানের এই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক মুসলমানদের জীবনে এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি করে। কারণ কোরআন তেলাওয়াত, অনুধাবন ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগের জন্য রমজান হলো সর্বোত্তম সময়।
রমজানের প্রধান ইবাদত রোজা। রোজা কেবল উপবাস থাকার নাম নয়, বরং এটি আত্মসংযম, তাকওয়া ও নৈতিক পরিশুদ্ধির প্রশিক্ষণ। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি চোখ, কান, জিহ্বা ও মনকে পাপ থেকে সংরক্ষণ করাই প্রকৃত রোজা। রোজার মাধ্যমে মানুষ ধৈর্যশীল হয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখে এবং আল্লাহভীতিতে পরিপূর্ণ হয়।
রমজান রহমতের মাস। এ মাসের প্রথম দশ দিন আল্লাহর বিশেষ রহমতে পরিপূর্ণ। বান্দা যখন আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তখন আল্লাহ তার প্রতি দয়ার দরজা খুলে দেন। দ্বিতীয় দশ দিন মাগফিরাতের। অতীতের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। আর শেষ দশ দিন জাহান্নাম থেকে নাজাতের সময়। এই শেষ দশ দিনে ইবাদতে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া, বিশেষ করে ইতিকাফ পালন করা, একজন মুমিনকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে।
রমজান দোয়া কবুলের মাস। এ মাসে বান্দার দোয়া সহজে কবুল হয়। বিশেষ করে ইফতারের মুহূর্তে দোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। একজন রোজাদার যখন সারাদিনের কষ্টের পর আল্লাহর দেওয়া রিজিক দিয়ে রোজা ভাঙে, তখন তার অন্তর নরম থাকে এবং আল্লাহর দরবারে তার দোয়া দ্রুত কবুল হয়। তাই এই মাসে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ কামনা করে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।
এই মাস আমাদের সামাজিক জীবনে সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে। রোজার কারণে ধনী-গরিব সবাই ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করে। ফলে দরিদ্র মানুষের প্রতি সহানুভূতি বাড়ে, দান-সদকার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। জাকাত, ফিতরা ও বিভিন্ন দান-খয়রাতের মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। রমজান আমাদের শেখায়, নিজে ভালো থাকাই যথেষ্ট নয়, অন্যের কষ্ট লাঘব করাও ইমানের দাবি।
রমজান আত্মসমালোচনার মাস। সারা বছরের ভুলত্রুটি, গুনাহ ও অবহেলার জন্য অনুতপ্ত হয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার শ্রেষ্ঠ সময় এটি। একজন মুমিন এই মাসে নিজেকে প্রশ্ন করে, সে কতটা আল্লাহর অনুগত, কতটা সত্যবাদী, কতটা ন্যায়পরায়ণ। এই আত্মসমালোচনার মাধ্যমেই চরিত্র সংশোধন ও আত্মগঠন সম্ভব হয়।
রমজানের রাতগুলোও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। তারাবির নামাজ, তাহাজ্জুদ, কোরআন তেলাওয়াত ও জিকিরের মাধ্যমে রাতগুলো আলোকিত হয়। বিশেষ করে লাইলাতুল কদর, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম, তা এই মাসেই অবস্থিত। এ রাতে ইবাদত করলে দীর্ঘ জীবনের ইবাদতের সওয়াব লাভ হয়। তাই মুমিনরা শেষ দশ রাত বিশেষভাবে ইবাদতে কাটানোর চেষ্টা করে।
আসুন, আমরা রমজানকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই, এর প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান করে তুলি এবং এই মাস শেষে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসেবে নতুন জীবন শুরু করার তওফিক লাভ করি।
লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদ্রাসা, গাজীপুর