আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৩ এএম

আজ দ্বিতীয় রোজা। আমরা প্রবেশ করেছি আত্মশুদ্ধির এক মহাসন্ধিক্ষণে। চারপাশের কোলাহল যেন খানিকটা স্তিমিত, হৃদয়ের ভেতর জেগে উঠেছে নরম এক ডাক। এই ডাক ফেরার, পরিশুদ্ধ হওয়ার এবং প্রভুর সান্নিধ্যে নিজেকে সমর্পণ করার। রমজান মাস মুমিনকে আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দেয়। সারা বছরের গাফিলতি, অবহেলা ও ব্যস্ততার ভিড়ে যে হৃদয় ভারী হয়ে ওঠে, এই মাস তাকে হালকা করে দেয়। রোজার সংযম দেহকে শাসন করে, তারাবির দীর্ঘ নামাজ মনকে প্রশান্ত করে, দোয়ার অশ্রু আত্মাকে সজীব করে। শুদ্ধতার এই আবহে আমাদের প্রতিটি ক্ষণকে আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।

বছরের বিভিন্ন সময়ে আমরা ব্যস্ত থেকেছি বস্তুগত নানা আয়োজনে এবং পার্থিব নানা ঝামেলা ও চাওয়া-পাওয়ার হিসেব নিয়ে। ফলে আমাদের অসচেতন আত্মা খোদাপ্রেমের রাজপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে কেবলই নেমে গেছে নিচ থেকে নিচুপর্যায়ে। তাই দরকার ছিল এমন একটি সুযোগ আসার, যেখানে আত্মাকে উন্নীত করা যাবে আধ্যাত্মিকতার উচ্চশিখরে।

আল্লাহতায়ালার একান্ত সান্নিধ্য লাভের জন্য হৃদয়-মনকে আল্লাহমুখী করে নামাজ আদায় করা এক অতি বড় সুযোগ, তাতে কোনো সংশয়-সন্দেহ নেই। অন্য ইবাদতগুলোতেও রয়েছে একই ধরনের সুযোগ। কিন্তু রমজানে খোদাপ্রেমের সুযোগগুলো অনেক বেশি প্রশস্ত এবং এ মাসে আল্লাহকে স্মরণ করার মাধ্যমগুলোও বেশি বৈচিত্র্যময়। যেমন নফল নামাজ ছাড়াও প্রেমময় জিকির-আজকার ও দোয়া-মোনাজাত রমজানের বাড়তি আকর্ষণ। খোদাপ্রেমের মোহনীয় সব সংলাপ শেখার এক দারুণ মাধ্যম এসব দোয়া-মোনাজাত। দোয়ার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর প্রিয় হয়, তার সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পায়। তাই আমাদের উচিত রমজানে বেশি বেশি দোয়া-মোনাজাত করা। এ প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘হে মানুষেরা। বেহেশতের দরজাগুলো এই মাসে তোমাদের জন্য খোলা থাকবে। আল্লাহর কাছে এমনভাবে দোয়া কর, যাতে তা তোমার জন্য বন্ধ হয়ে না যায়। রমজান মাসে দোজখের দরজাগুলো বন্ধ রয়েছে, আল্লাহর কাছে এমনভাবে প্রার্থনা কর, যাতে তা তোমার জন্য কখনো খুলে না যায়। এ মাসে শয়তানগুলোকে হাতকড়া পরিয়ে বন্দি রাখা হয়েছে, আল্লাহর কাছে এমনভাবে প্রার্থনা কর, যাতে তারা তোমাদের ওপর কর্র্তৃত্ব করতে না পারে।’

হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রোজাদারের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। ইরশাদ হয়েছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। এক. রোজাদারের দোয়া ইফতার পর্যন্ত। দুই. ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া। তিন. মজলুমের দোয়া। আল্লাহতায়ালা তাদের দোয়া মেঘমালার ওপরে উঠিয়ে নেন। এ জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। আর আল্লাহতায়ালা বলেন, আমার ইজ্জতের কসম। বিলম্বে হলেও আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব।’ (জামে তিরমিজি)

রমজানে রোজাপালন, নামাজ আদায় ও দোয়া-মোনাজাতের মাধ্যমে বিশেষ ফজিলত ও বরকত অর্জন ছাড়াও কোরআন তেলাওয়াত এ মাসের নুরানি আকর্ষণের বাড়তি দিক। রমজান মাসকে বলা হয় কোরআনের বসন্তকাল। আত্মগঠন ও চরিত্র সংশোধন এবং মনের ওপর জমে থাকা মরিচাগুলো অপসারণের মাধ্যমে নিজেকে পবিত্র করার ও সব জঞ্জাল এবং পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করার মাধ্যম হলো কোরআন তেলাওয়াত ও অধ্যয়ন। তাই রমজানে কোরআন তেলাওয়াতে বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত।

রমজান আল্লাহর দিকে সফর করার মাস। তবে মনে রাখতে হবে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো, গুনাহ বর্জন করা। ফরজ ও নফলসহ আমরা যত বেশিই ইবাদত করি না কেন, পাপ বর্জন করা না হলে কাক্সিক্ষত আত্মসংশোধন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা অসম্ভব হয়ে যাবে।

লেখক : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত