ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেরে গেলেও খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ (সিটি করপোরেশন-১ শাখা) রবিবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। তার নিয়োগ পাওয়ার পর উচ্ছ্বসিত তার সমার্থকরা।
প্রশাসক নিয়োগের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা। সদ্য নির্বাচনী পরাজয়ের পর এটিকে রাজনৈতিকভাবে স্বস্তির ঘটনা হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
মহানগর বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তার ফেসবুক পোস্টে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে অভিনন্দন জানিয়ে, সুযোগ আবারও এসেছে, আসুন সকলে মিলে বিএনপি নামক অস্তিত্বটাকে শক্তিশালী করি। আমাদের সকলে মিলে একটি পক্ষ হতে হবে। আর একটি পক্ষ হওয়ার সবচেয়ে বড় শর্ত হচ্ছে সব পক্ষ থেকে খারাপ লোকের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে হবে। আমার পক্ষের সব্বাই দুধে ধোয়া তুলসী পাতা আর অন্যদের সক্কলে আবর্জনা, এই মানসিকতা থেকে বের হতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগরীর বড়বাজারের একজন ব্যবসায়ী বলেন, প্রশাসক হিসাবে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে দায়িত্ব দেওয়ায় বড়বাজারসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
তবে শারীরিকভাবে অসুস্থ নজরুল ইসলাম মঞ্জু বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। আজ সোমবার মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, আমি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করব। নগরবাসীর সকল সুযোগ-সুবিধার জন্য আমি কাজ করব। নগরবাসী যাতে ভালো থাকে, নাগরিক জীবন যাতে সুস্থ ও সুন্দর হয়, নিরাপদ হয় সে জন্য আমার প্রচেষ্টা থাকবে। খুলনা মহানগরীর মানুষ দৈনন্দিনভাবে যে সমস্যার সম্মুখীন হয় সেই সব সমস্যা দূর করে নগরীর মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই হবে আমার মূল দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, মঙ্গলবার সকাল ১০টায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদ ভবনে ডেকেছেন। তার সঙ্গে দেখা করে ও চিকিৎসা শেষে দ্রুত সময়ের মধ্যে খুলনায় এসে কাজ শুরু করব।
স্থানী বিএনপি সূত্র ও নেতাকর্মীরা জানান, ২০২১ সালের আগে দীর্ঘ ২৮ বছর খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এর মধ্যে ১৬ বছর সাধারণ সম্পাদক ও ১২ বছর ছিলেন সভাপতি। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা বিভাগে বিএনপি জোটের ভরাডুবির মধ্যেও শুধু খুলনা-২ আসনে জয় পান বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। একই বছরের খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী ছিলেন নজরুল ইসলাম। দুবারই তিনি হেরে যান। বিএনপি নির্বাচন দুটিতে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ করেছিল।
এরপর ২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর হঠাৎ কেন্দ্র থেকে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপির আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ঐ কমিটিতে খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতির পদ থেকে নজরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে বাদ দেওয়া হয়। নতুন ঘোষিত কমিটিতে তাকে বাদ দেওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঐ বছরের ১২ ডিসেম্বর খুলনা প্রেস ক্লাবে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। ঐ সংবাদ সম্মেলনে খুলনা মহানগরের ৩১টি ওয়ার্ড কমিটির অধিকাংশেরই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলন থেকে তিনি নতুন কমিটির পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান। এরপর কেন্দ্র থেকে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়।
২০২১ সালে খুলনা মহানগর বিএনপির কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর থেকে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর সঙ্গে বর্তমান অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা ও শফিকুল আলমের তুহিনের নেতৃত্বাধীন কমিটির নেতাকর্মীদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। মহানগর বিএনপির থানা ও ওয়ার্ড কমিটি থেকেও বাদ দেওয়া হয় মঞ্জু অনুসারীদের। দলীয় পদ হারানোর পরও রাজনীতি থেকে সরে যাননি তিনি। বিভিন্ন ব্যানারে রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়েছেন।
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে মঞ্জুকে প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও মহানগর বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অনেক নেতা এবং অনুসারীরা তা মেনে নিতে পারেননি। এমনকি প্রাথমিক মনোনয়ন ঘোষণার পরও দুই পক্ষ আলাদা কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করে। মঞ্জুর প্রার্থিতা বাতিলের দাবিও জানান বর্তমান কমিটির নেতারা। একপর্যায়ে প্রকাশ্য বিরোধ মিটিয়ে দুই পক্ষের নেতারাই মঞ্জুর পক্ষে মাঠে নামেন। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তার এই পরাজয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। দলীয় সমন্বয়ের ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে তার পরাজয়ের বড় কারণ হিসেবে দেখা হয়।
এ ছাড়া সংসদ নির্বাচনের পর থেকে বিএনপির দুই গ্রুপের নেতাকর্মীদের পরষ্পরের প্রতি দোষারোপের প্রবণতা বাড়তে থাকে। দলটির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে ভবিষ্যতে বিএনপি ঠিকমতো ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলে। আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী কে হতে পারেন, তা নিয়েও নানা গুঞ্জন শুরু হয়। দলীয় কোনও পদ-পদবি না থাকা নজরুল ইসলাম মঞ্জুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। তবে এসব আলোচনার মধ্যেই গত রবিবার খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় তাকে।
