কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা আবুল হাসেমের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে গত ১০ বছরে প্রায় ১ কোটি টাকার সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে, যা আয়ের প্রায় দ্বিগুণ।
জেলা কৃষি অফিস ও একাধিক সূত্রে জানা যায়, আবুল হাসেম ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ব্লক সুপারভাইজার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। পরে ২০০৫ সালে বাজিতপুর উপজেলায় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত হন। ২০০৬ সালে বদলি হয়ে নিজ উপজেলা তাড়াইলে যোগ দেন এবং সেখানে টানা ৯ বছর দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৫ সালে ইটনা উপজেলায় সমমান পদে উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। পরে ২০১৭ সালে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় বদলি হন। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, কিশোরগঞ্জ সদরে যোগদানের পর থেকেই তিনি বিভিন্নভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এর পর থেকেই জমি কেনা শুরু করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার চরতালজাঙ্গা এলাকায় ২০ শতাংশ জমি কেনেন আবুল হাসেম। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল জলিলের কাছ থেকে জমিটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকায় কেনা হলেও দলিলে মূল্য দেখানো হয় তিন লাখ ৯৮ হাজার টাকা। এর আগে, ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট একই এলাকায় ১২ শতাংশ জমি কিনেন ২৬ লাখ টাকায়। তবে দলিলে উল্লেখ করা হয় মাত্র ৫ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে চরতালজাঙ্গা এলাকায় সাজেদুল ইসলাম সাজুর কাছ থেকে ১০ শতাংশ জমি ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায় কেনেন আবুল হাসেম। জমির খারিজ জটিলতার কারণে এটিরও দলিল হয়নি। একই বছরের ১৮ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ সদরের বগাদিয়া এলাকায় মাছুম আকন্দ, রাদিফা আক্তার ও খন্দকার তাহমিনা ইজদানীর কাছ থেকে সিএস ৩২৩৬ ও ৩২৩৮ দাগে চার শতাংশ জমি কেনেন ১৮ লাখ ৪১ হাজার টাকায়।
এছাড়া ২০২৩ সালে একই এলাকায় তার ভাই আবুল কাশেমের কাছ থেকে ৩০ শতাংশ জমি কেনেন ৯ লাখ টাকায়। ২০২৪ সালে তার কাছ থেকেই ২৫ শতাংশ জমি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২৫ শতাংশ জমি ৭ লাখ টাকায় কেনেন। তবে বাটোয়ারা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এসব জমির দলিল সম্পন্ন হয়নি বলে জানা গেছে। এর আগে ২০১৭ সালে সদর উপজেলার মহিনন্দ ইউনিয়নের ভাটপাড়া গ্রামের ফাহমিদা বেগমের কাছ থেকে তিন শতাংশ জমি ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায় কেনেন। তবে খারিজ সংক্রান্ত জটিলতায় সেটির রেজিস্ট্রি হয়নি। এসব জমির দলিলমূল্য অনুযায়ী মোট মূল্য দাঁড়ায় ৬৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, জমিগুলোর প্রকৃত বাজারমূল্য ৯৫ লাখ ৪১ হাজার টাকারও বেশি।
কৃষি অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ১০ বছরে আবুল হাসেমের মোট বেতন দাঁড়ায় ৪১ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ টাকা। বাসাভাড়া বাবদ পেয়েছেন ১৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭১২ টাকা। এ ছাড়া চিকিৎসাভাতা হিসেবে পেয়েছেন ১ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি টাকা আত্মসাতে পটু তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল হাসেম বলেন, ‘আমি স্থানীয়ভাবে নিজের কৃষিজমি চাষাবাদ করে লাভবান হয়ে সেই টাকায় সম্পত্তি কিনেছি।’ তবে তার দাবির সঙ্গে স্থানীয়দের বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়নি।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়নুল আলম তালুকদার জানান, সম্প্রতি তিনি এখানে যোগদান করেছেন। দায়িত্বগ্রহণের পর থেকে তার কাছে এ পর্যন্ত কেউ কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করেনি। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
